এডুয়ার্ডো সাভেরিন: ফেসবুকের শেয়ার কমলেও বিলিয়নিয়ার হওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প
ফেসবুকের ইতিহাসে যেসব নাম উজ্জ্বলভাবে জ্বলজ্বল করে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো এডুয়ার্ডো সাভেরিন (Eduardo Saverin)। ফেসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার অবদান অম্লান, যদিও আজকের দিনে ফেসবুকে তার শেয়ারের অংশ খুবই সামান্য। তবুও, আশ্চর্যজনকভাবে এই সামান্য শেয়ারই তাকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিদের একজন করে তুলেছে।
ফেসবুকের সূচনালগ্নে সাভেরিনের বিনিয়োগ:
২০০৪ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র হিসেবে মার্ক জাকারবার্গের সঙ্গে ফেসবুকের (তখনকার “The Facebook”) যাত্রা শুরু করেন সাভেরিন। ফেসবুকের প্রাথমিক কার্যক্রম চালানোর জন্য তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন প্রায় ১৫,০০০ ডলার, যা সেই সময় একটি বড় অঙ্কের অর্থ ছিল এক শিক্ষার্থীর জন্য।
এই বিনিয়োগ এবং তার ব্যবসায়িক দক্ষতার ফলেই ফেসবুক দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। সেই সময়ে সাভেরিনের ফেসবুকে প্রায় ৩০% মালিকানা ছিল।
বন্ধুত্বের ফাটল এবং আইনি লড়াই:
যথাযথ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের কারণে সাভেরিন এবং জাকারবার্গের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
আইনি দ্বন্দ্ব: সাভেরিনের শেয়ার কমানোর চেষ্টায় জাকারবার্গের ভূমিকা নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়।
সমঝোতা: অবশেষে একটি গোপন সমঝোতার মাধ্যমে সাভেরিন ফেসবুকের "Co-founder" হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং তার হাতে প্রায় ২% এরও কম শেয়ার থাকে।
শেয়ার কমলেও বিলিয়নিয়ার! কিভাবে সম্ভব?
এখানেই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। অনেকে ভাবতে পারে, ফেসবুকের মাত্র ২% এরও কম শেয়ার থাকলে কীভাবে তিনি বিলিয়নিয়ার হলেন?
1. ফেসবুকের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি:
ফেসবুক যখন ২০১২ সালে পাবলিকলি ট্রেড করা শুরু করে, তখন কোম্পানির মূল্য ছিল প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালে ফেসবুকের মূল কোম্পানি Meta Platforms-এর বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন ডলার।
এই বিশাল মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাভেরিনের ছোট্ট শেয়ারও বিলিয়ন ডলারের সম্পদে পরিণত হয়েছে।
2. বিনিয়োগের বিস্তৃতি:
ফেসবুক থেকে আয় করা অর্থ সাভেরিন দক্ষতার সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছেন।
বর্তমানে তিনি B Capital Group নামে একটি বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা প্রযুক্তি খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিচালনা করে।
3. ট্যাক্স সুবিধা:
২০১১ সালে সাভেরিন সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। এর ফলে তিনি ফেসবুক শেয়ার বিক্রির ওপর বড় অঙ্কের কর প্রদানের ঝামেলা থেকে রেহাই পান।
বর্তমানে সাভেরিনের নেট ওয়ার্থ:
নেট ওয়ার্থ (২০২৪): আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
প্রধান আয়ের উৎস: ফেসবুকের শেয়ার, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ, এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যবসা।
এই ছোট্ট শেয়ারই তাকে এনে দিয়েছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী হিসেবে একটি শক্তিশালী অবস্থান।
এডুয়ার্ডো সাভেরিনের দৃষ্টিভঙ্গি:
একটি সাক্ষাৎকারে সাভেরিন বলেছিলেন:
"বড় কিছু তৈরি করতে গেলে সব সময় শতভাগের মালিক হওয়ার প্রয়োজন হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই স্বপ্নের অংশীদার থাকা, যা বিশ্বকে বদলে দিতে পারে।"
এই উক্তিটি তার জীবনের সত্যিকারের প্রতিফলন।
এডুয়ার্ডো সাভেরিনের গল্প প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে নেওয়া একটি ছোট সিদ্ধান্ত বা বিনিয়োগও জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। ফেসবুকে তার শেয়ার হয়তো কম, তবে সেই শেয়ারের মূল্য তাকে দিয়েছে এক অবিশ্বাস্য সফলতা, যা নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা।