রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১৮ বছর এক লড়াকু বাবার জীবন খতিয়ান
- Politics
- International
- Crime
- Law-Court
- Entertainment
- Religion and Education
- District News
- Exclusive
- Sports News
- Agriculture-Economy and Trade
- Interview
- Ramadan
- Documentary
- Health & Beauty
- Earn Money Online
- Kids
- Tech Review
- Book Review
- History
- Tour and Travel
- Stock Market
- Bangladesh
- Stock Video Footage
- Podcast
- Fact Checking
- Campus
- Investigative
- Other
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১৮ বছর এক লড়াকু বাবার জীবন খতিয়ান
ভোর তখনো ভালো করে ফোটে না। চারপাশ খাকে আবছা অন্ধকারে ঢাকা। গ্রামের সিংহভাগ মানুষ থাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই শুরু হয় পঞ্চান্ন বছর বয়সি পাটোয়ারীর দিন। পুরো নাম মোহাম্মদ শাহজাহান পাটোয়ারী। পিঠে সামান্য বাঁক ধরেছে, কিন্তু পায়ে এখনো তারুণ্যর গতি। তিনি একজন সংবাদপত্র বিক্রেতা-যাদের আমরা সহজ ভাষায় বলি ‘হকার'। কোনো বিলাসবহুল উপাখ্যান নয়। তাঁর জীবনকাহিনি মূলত প্রতিদিনের লড়াই, সততা এবং নিয়মানুবর্তিতার এক জীবন্ত গল্প। ভোর ৬টার চেনা সাইকেল ও চিরচেনা ব্যস্ততা। চোখ রগড়াতে রগড়াতে শাহজাহান পাটোয়ারী যখন সাইকেলটা নিয়ে বের হন, তখন রাস্তায় প্রকৃতির ক্ষীণ আলো ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাঁর গন্তব্য স্থানীয় সংবাদপত্রের এজেন্টের অফিস। সেখানে গিয়েই শুরু হয় আসল ব্যস্ততা-জাতীয়, আঞ্চলিক ও বিনোদনমূলক পত্রিকাগুলো বাছাই ও ভাঁজ করা, ভেতরে বিজ্ঞপ্তির কাগজ বা সাপ্লিমেন্টগুলো ঝটপট ঢুকিয়ে নেওয়া এবং কোন এলাকায় কোন বাড়িতে কোন পত্রিকা যাবে, তা মুখস্থ রেখে নিখুঁতভাবে বান্ডিল সাজানো। ঠিক সকাল ৬টা। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই সাইকেলের ক্যারিয়ারে পত্রিকার বোঝা বেঁধে প্যাডেল চাপতে শুরু করেন তিনি। রোদ-বৃষ্টি কোনো কিছুই তাঁর এই যাত্রাকে থামাতে পারে না। এক গাল হেসে শাহজাহান পাটোয়ারী বলেন, "মানুষ সকালে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পত্রিকা না দেখলে দিনটাই শুরু করতে পারে না। তাই আমারও বসে থাকার উপায় নেই।" তবে বর্ষাকালে কষ্টের সীমা থাকে না তাঁর। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, আর প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে পরম যত্নে ঢাকা থাকে কাগজের বান্ডিল। নিজের শরীর ভিজলেও পত্রিকার একটি পাতাও যেন না ভিজে-এটাই থাকে তাঁর প্রধান চিন্তা। আবার তীব্র গরমে যখন পিচঢালা রাস্তা থেকে আগুন ওড়ে, তখনও ক্লান্তিহীনভাবে তিনি বহুতল ভবনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন পত্রিকা পৌঁছে দিতে। জীবনের কঠিন সমীকরণ ও দুই চাকার চালকের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার ইক্ষাদাসপুর গ্রামে হলেও, প্রায় ১৮ বছর ধরে জীবিকার টানে শাহজাহান পাটোয়ারী সপরিবারে বসবাস করছেন ঢাকার দোহারের জয়পাড়া বাজারে—একটি ভাড়া করা টিনের ঘরে। স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। বড়ো মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেজো মেয়েটি শত কষ্টের মাঝেও আইএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে আর ছোট মেয়েটি পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। এই বড়ো পরিবারটির টানাপড়েন সামলাতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সাইকেল নিয়ে মাইলের পর মাইল ছুটে চলেন তিনি। কিন্তু দিনশেষে এই হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে খরচ বাদে তাঁর মাসিক আয় হয় মাত্র ১১ হাজার টাকার মতো। জীবন যুদ্ধে বর্তমান বাজারের আগুনমূল্যের এই সময়ে সামান্য ১১ হাজার টাকায় সংসার চালানো যেখানে অসম্ভব, সেখানে পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে দুপুরের পর অন্য কাজে যুক্ত হন তিনি। ক্লান্তি ভুলে বিকেলে কাজ করেন একটি মসজিদের পরিচর্যার। সেখান থেকে মাসে আসে আরও ৫ হাজার টাকা। দুইয়ে মিলিয়ে ১৬ হাজার টাকার এই সামান্য পুঁজিতেই চলে এক মধ্যবিত্ত বাবার নীরব দীর্ঘশ্বাসের সংসার। আয়ের উৎস মাসিক আয় সংবাদপত্র বিক্রি (হকার) ১১,০০০ টাকা, মসজিদের পরিচর্যা ৫,০০০ টাকা, মোট আয় ১৬,০০০ টাকা। এই জীবন যুদ্ধে শাহজাহান পাটোয়ারীর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৮ সালে হঠাৎ একটি স্ট্রোক তাঁর শরীরের স্বাভাবিক গতি কেড়ে নেয়। স্ট্রোকের পর থেকে একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ সাইকেলের প্যাডেল চাপতে শরীর আর সায় দেয় না, প্রচণ্ড কষ্ট হয়। কিন্তু ঘরে ক্ষুধার্ত মুখ আর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই শারীরিক কষ্টকে তুচ্ছ জ্ঞান করেই প্যাডেল চেপে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাহজাহান পাটোয়ারী জানান, ডিজিটাল স্ক্রিনের ভিড়ে কাগজের পত্রিকার চাহিদা দিন দিন কমছে। মানুষ এখন আর আগের মতো মুদ্রিত পেপার কিনে পড়তে চায় না। আর এর সাথে সাথে সংকুচিত হয়ে আসছে এই প্রবীণ হকারের রুটি-রুজির পথও। মোহাম্মদ শাহজাহান পাটোয়ারী কেবল একজন হকার নন, তিনি আমাদের সমাজের সেই নীরব লড়াকু বাবাদের একজন-যাঁরা নিজেরা ক্ষয়ে গিয়েও সন্তানদের আগলে রাখেন বটবৃক্ষের মতো। প্রযুক্তির জোয়ারে হয়ত কাগজের পত্রিকার পাতা ওলটানোর দিন ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু শাহজাহান পাটোয়ারীর মতো মানুষদের সততা ও ত্যাগের গল্পগুলো কখনো পুরোনো হওয়ার নয়। এই নিঃশব্দ নায়কদের জীবনযুদ্ধ সমাজকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজের নাম-‘সংসার চালানো’।