এস এম তারেকুর রহমান
এস এম তারেকুর রহমান
২৮ জুন ২০২৬—বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পথে একধাপ এগিয়েছে। সংবাদটি নিঃসন্দেহে একফালি রোদ, পাহাড়ের ঘন কুয়াশা ভেদ করে আসা আশার আভা। তবু এই আলোর পাশে ছায়া হয়ে দাঁড়ায় একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন—এতদিন কেন এই অপেক্ষা?
শিক্ষা কি তাদের জন্য কম জরুরি? প্রশ্নগুলো রূঢ়, কিন্তু বাস্তবতা আরও রূঢ়। বছরের পর বছর পাহাড়ি জনপদে শিক্ষা রাষ্ট্রীয় অবহেলার করুণ উপাখ্যান হয়ে থেকেছে। শিক্ষক নেই, শ্রেণিকক্ষ জীর্ণ, পাঠ্যবই পৌঁছায় বর্ষা পেরিয়ে। নদী, পাহাড় আর প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার ত্রিভুজে বন্দি হয়ে প্রতিদিন ক্ষয় হয় শিশুদের মৌলিক অধিকার।
এই প্রেক্ষাপটে তিন্দুর একটি বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ কোনো করুণা নয়। এটি রাষ্ট্রের বিলম্বিত কর্তব্য পালনের এক ক্ষুদ্র, অথচ প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি। অধিকার কখনো অনুগ্রহ হতে পারে না—এ সত্য যত দেরিতে উপলব্ধি করা যায়, তত বেশি মূল্য দিতে হয় একটি প্রজন্মকে।
এই উদ্যোগের পেছনে আছেন সুফল চাকমার মতো নীরব প্রহরীরা। তাঁদের কলমে উঠে এসেছে তিন্দুর স্কুলটির দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনার করুণ কাহিনি। তাঁদের লেখা পৌঁছেছে সংসদের কক্ষে, নীতিনির্ধারকের টেবিলে।
আছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। সাঙ্গুর বুকে নৌকা বেয়ে যিনি শিক্ষকদের সামান্য ভাতা জোগাড় করেন, বিদ্যালয়টিকে বাঁচিয়ে রাখেন নিজের কাঁধে। পাহাড়ের মানুষেরা নিঃশব্দে সমাজের ভার বয়—এটাই তাঁদের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব নিয়মতান্ত্রিকভাবে পালনের কথা, তা যদি বারবার সচেতন নাগরিকের ব্যক্তিগত ত্যাগের উপর ভর করে দাঁড়ায়, তবে সেটি আর সাফল্য থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি।
আমাদের সংবিধান এবং জাতীয় শিক্ষানীতি—দুটোই পাহাড়ি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষাকে অগ্রাধিকারের কথা বলে। অথচ বাস্তবে পাহাড়ের শিক্ষা আজও প্রকল্পনির্ভর, দাতা-সহায়তার মুখাপেক্ষী, অনিশ্চিত।
যদি জাতীয়করণ কেবল বিদ্যালয়ের নামফলকে নতুন রং হয়ে থেমে যায়—যদি স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ না হয়, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না আসে, প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত না হয়—তবে তিন্দুর এই উদ্যোগও আরেকটি ফাঁপা আশার নামান্তর হবে। নামফলক পেট ভরায় না, ভবিষ্যৎও গড়ে না
পাহাড়ে শিক্ষা নিশ্চিত না করে উন্নয়ন, শান্তি কিংবা সমতার কথা বলা কেবল বাগাড়ম্বর। শিক্ষা কোনো দয়ার দান নয়—এটি সাংবিধানিক অধিকার, মানবিক মর্যাদার ভিত্তি। এই অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রকে তার নীরবতার দায় নিতেই হবে।
তিন্দুর এই ক্ষুদ্র প্রদীপ দৃষ্টান্ত হোক, ব্যতিক্রম নয়। পাহাড়ের প্রতিটি ঝির পাশে, প্রতিটি পাড়ায় যেন জ্বলে ওঠে এমন আলো। কারণ একটি জাতি ততটাই উন্নত, যতটা আলোকিত তার সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুটির চোখ।
