শেষ রাতে ভেলা ভাসিয়ে দোহারে লোকজ উৎসব ‘ভেইড়া ভাসান’ সম্পন্ন
শেষ রাতে ভেলা ভাসিয়ে দোহারে লোকজ উৎসব ‘ভেইড়া ভাসান’ সম্পন্ন
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার
যান্ত্রিকতার দাপট ও আধুনিক বিনোদনের তোড়ে বহু লোকজ আচার হারিয়ে গেলেও, ঢাকার দোহারে পদ্মাপাড়ের মানুষ প্রতি বছরের মতো এ বারেও মেতে উঠেছিল তাদের শতবর্ষী ঐতিহ্য ‘ভেইড়া ভাসান’ বা ভেলা ভাসানো উৎসবে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই লোকজ উৎসবের সমাপ্তি ঘটে আজ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) শেষ রাতে। ভোর প্রায় তিনটায় নদীর স্রোতে শেষ ভেলাটি ভাসিয়ে দেয়ার মাধ্যমে এর সমাপ্তি হয়। কালের বিবর্তনে আয়োজনের জমকালো রূপ কিছুটা স্তিমিত হলেও, স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ‘ভেইড়া ভাসান’ কেবল কোনো সাধারণ উৎসব নয়, এটি নদী অববাহিকার মানুষের সাথে প্রকৃতির আত্মিক সম্পর্কের দলিল। সাধারণত বর্ষার শেষভাগে কিংবা ভাদ্র-আশ্বিন মাসে নদী ও জলাশয়ের প্রতিকূল পরিবেশ, প্লাবন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে গ্রাম ও গবাদিপশু রক্ষার মানত হিসেবে এই ভেলা ভাসানো হয়। কলার ভেলা কেটে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে তাতে জ্বলন্ত প্রদীপ, ফুল ও নৈবেদ্য দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীর স্রোতে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই ভাসমান ভেলাই লোকালয় থেকে সমস্ত অপশক্তি ও বিপদ-আপদ দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে নদী ও খালের পাড় ঢাক-ঢোল, কাঁসা এবং কাঁসরের তালে মুখরিত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় বসে ঐতিহ্যবাহী গানের আসর, আর তার সাথেই জমে ওঠে গ্রামীণ মেলা। রঙিন কাগজ ও আলোয় সাজানো কলার ভেলা একের পর এক নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করতে নদীর ঘাটে ঢল নামে নারী, পুরুষ ও শিশুদের। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান যুগেও ভেইড়া ভাসানের এই মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শেকড় ও আবহমান সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখছে।
কালের পরিক্রমায় দোহার-নবাবগঞ্জের এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতি রক্ষা করা এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়োজকদের মতে সরকারি-বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এমন মৌলিক উৎসবগুলোকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। গ্রাম বাংলার নিজস্ব আত্মপরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে এই লোকজ ঐতিহ্যের নিয়মিত সংরক্ষণ ও সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে বিভিন্ন মেলার আয়জকরা মনে করেন।