বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। ৪ অক্টোবর ঘোষিত এই নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী সিলিন্ডার প্রতি ২৫২ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে বিইআরসি এই দাম সমন্বয় করলেও, মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে শুধু রান্নার খরচই বাড়ছে না, বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় সূচকেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফাভোগী চক্র অসাধু ব্যবসার সুযোগ নিচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হওয়া সত্ত্বেও বাজারে তা আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, যা ভোক্তাদের সরাসরি শোষণ করার শামিল। ভুক্তভোগী সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো ধরনের ঘোষণা আসার আগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সিলিন্ডার মজুত করে বাজারে কৃত্রিম হাহাকার সৃষ্টি করেছে। সাধারণ ক্রেতাদের ভাষ্যমতে, একদিকে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে চড়া দামে কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক এলপিজি অপারেটর আগেভাগে এলপিজি মজুত করে এবং ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরের সীমানার কাছে জাহাজ নোঙর করে রেখে বাজারে এই সংকট ও উচ্চমূল্যের পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোটাব) নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সংকটের দায় নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। লোটাব নেতারা আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির উচ্চমূল্যের বিষয়টি তুলে ধরে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও, সরকারের পক্ষ থেকে মজুত ও কৃত্রিম সংকট নিয়ে কঠোর জবাব চাওয়া হয়েছে। তবে বৈঠকের পর জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করতে রাজি না হওয়ায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। অপারেটররা বিইআরসির বর্তমান মূল্য নির্ধারণের হারকে অপর্যাপ্ত দাবি করে আরও বেশি দাম বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা কার্যত ভোক্তাদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে ব্যবসায়ীদের মুনাফাকেই প্রাধান্য দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, দাম বাড়ালেই আমদানির সুবিধা হবে—এমন যুক্তি দিয়ে অপারেটররা মূলত বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছে।
এলপিজি খাতের এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। যদি অসাধু অপারেটরদের সিন্ডিকেট ভেঙে না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে দেশীয় বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে, তা নিরসনে বিইআরসি এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। কেবল দাম নির্ধারণ করে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং সেই দাম যেন বাজারে কার্যকর থাকে এবং সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল চ্যালেঞ্জ। এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।