দেশের সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আগামী ৬ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা দেশের ৩৮টি জেলার ১৬৮টি উপজেলার প্রায় ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০টি নিবন্ধিত জেলে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ১৬ হাজার ১৫৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। মূলত ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রজনন মৌসুমের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই কঠোর বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি জেলে পরিবারকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল প্রদানের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন ৮ অক্টোবরের মধ্যেই এই খাদ্যসহায়তা প্রকৃত কার্ডধারী জেলেদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা হয়, যা নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়জুড়ে তাদের জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।
নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া জেলে পরিবারগুলোর জন্য এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাঠ পর্যায়ে এর বণ্টন প্রক্রিয়া ও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। বহু নিবন্ধিত জেলেই অভিযোগ করেন যে, তালিকার সঠিক যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে অনেক সময় প্রকৃত মৎস্যজীবীরা সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যান, আবার কখনো কখনো মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপের কারণে বিতরণে অস্বচ্ছতা তৈরি হয়। এছাড়া, দীর্ঘ ২২ দিন জাল ফেলে উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলেদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যে আর্থিক সংকট তৈরি হয়, ২৫ কেজি চাল সেই বিশাল অভাবের তুলনায় একেবারেই নগণ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, শুধুমাত্র চাল নয়, বরং এই সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বা আর্থিক প্রণোদনার অভাব জেলেদের বাধ্য করে অনেক সময় গোপনে নদীতে নামতে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জেলেদের মধ্যে এক ধরনের রেষারেষি তৈরি করে এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকারের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ভিজিএফ চাল বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও ট্যাগ কর্মকর্তার সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের দ্রুত সময়ের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুকূলে বরাদ্দ উপ-বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে তা বিতরণের সময়সীমাও কঠোরভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, নিবন্ধিত বা কার্ডধারী জেলে ছাড়া অন্য কাউকে এই চাল দেওয়া যাবে না এবং বিতরণ শেষে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে এর যথাযথ হিসাব অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই সুনির্দিষ্ট মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত জেলেদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না, যাতে জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে নামার পরিবর্তে প্রজনন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন।
মা ইলিশ সংরক্ষণের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের মৎস্য খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য হলেও, জেলেদের জীবনমান ও সহায়তার পরিধি নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। প্রতি বছর এই নিষেধাজ্ঞা আসলেও জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, যা মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকারের নেওয়া কঠোর পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। যদি ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি করা না যায় এবং জেলেদের বিকল্প আয়ের স্থায়ী কোনো উৎস তৈরি না হয়, তবে কেবল চাল বিতরণের মাধ্যমে প্রজনন মৌসুমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে মৎস্য খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।