চাঁদপুরের মিষ্টি বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যপণ্য নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে স্থানীয় বেশ কিছু মিষ্টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হাইড্রোজ নামক অননুমোদিত ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। মিষ্টির বাহ্যিক ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ কাল দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই কেমিক্যাল ব্যবহার করছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। জেলাজুড়ে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হওয়া মিষ্টির অস্বাভাবিক সাদা রঙ এবং কৃত্রিম উজ্জ্বলতা স্বাভাবিক দুধ ও ছানার তৈরি মিষ্টান্নের গুণগত মান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত, যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তা আইনের লঙ্ঘন। মূলত অধিক মুনাফার নেশায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী জনস্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে এই বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে মিষ্টি তৈরি করছে, যা স্থানীয় মিষ্টি শিল্পের ঐতিহ্য ও সুনামকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই মিষ্টি গ্রহণ করায় বিষয়টি এখন জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
ভুক্তভোগী ক্রেতাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে মিষ্টির স্বাদ ও গন্ধে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা নিয়মিত মিষ্টি ভক্ষণকারীদের মধ্যে শারীরিক অস্বস্তির জন্ম দিচ্ছে। অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেছেন যে, এই মিষ্টি খাওয়ার পর তাদের হজমজনিত সমস্যা ও শারীরিক অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ ছানার মিষ্টির ক্ষেত্রে হওয়ার কথা নয়। ভুক্তভোগীদের মতে, বাজারের মিষ্টিতে এখন আর আগের মতো খাঁটি দুধের স্বাদ পাওয়া যায় না, বরং এক ধরনের রাসায়নিক গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে যা তাদের শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত এই ধরনের কেমিক্যাল মানবদেহে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। শিশু এবং বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেশি, যারা এ ধরনের বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন।
এই গুরুতর পরিস্থিতির বিপরীতে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ, যারা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও কার্যকর খাদ্য পরীক্ষার অভাবকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করায় এবং নমুনা পরীক্ষার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্তাধীন বলে জানানো হয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবে সাধারণ মানুষের দাবি হলো কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, মিষ্টির মতো অতি সাধারণ খাদ্যপণ্যে এ ধরনের রাসায়নিক মেশানো বন্ধ করতে হলে প্রতিটি উৎপাদন কারখানায় কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে গুণমান নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, অন্যথায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই ব্যর্থতা আরও ঘনীভূত হবে।
মিষ্টি শিল্পে এই ধরনের রাসায়নিকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা না গেলে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দীর্ঘদিনের ব্র্যান্ড ইমেজ সংকটের মুখে পড়বে এবং ভোক্তা আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট কেবল স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমগ্র জেলা ও আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে। এখনই যদি কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা না হয়, তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের খাদ্য বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। জনস্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই কেবল এই অসাধু চর্চা রোধ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করতে পারে।