একজন ছেলে সচিব।
একজন ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
আরেকজন কানাডা প্রবাসী।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
শুনলে মনে হয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। সমাজ তাদের উদাহরণ হিসেবে দেখাবে। আত্মীয়স্বজন বলবে, "দেখো, কী সফল সন্তান!"
কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে একজন মায়ের আশ্রয় হলো মেয়ের বাড়ি। তারপর একদিন নিঃসঙ্গ ঘরে মৃত্যু। কয়েকদিন কেউ খবরও রাখেনি। দরজা ভেঙে যখন মানুষ ঢুকল, তখন লাশে পচন ধরেছে।
প্রশ্ন জাগে, এ কেমন সাফল্য?
আমরা কি সত্যিই সন্তান মানুষ করছি, নাকি শুধু পেশাজীবী তৈরি করছি?
আজকের সমাজে সন্তান পালনের একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ চায় সন্তান ডাক্তার হোক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ সচিব, কেউ বিদেশে স্থায়ী হোক। স্কুলের ফলাফল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, চাকরির পদমর্যাদা, বিদেশি পাসপোর্ট, ব্যাংক ব্যালেন্স, ফ্ল্যাট আর গাড়ি দিয়ে আমরা সাফল্য মাপছি।
কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায় কখনোই করি না।
সন্তানটি কি মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখেছে?
সে কি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারবে?
সে কি প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়াবে?
সে কি নিজের সাফল্যের ভেতর মানবিকতার জন্য একটু জায়গা রাখবে?
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু আয় বৃদ্ধি নয়। শিক্ষা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করারও কথা। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার নম্বর আছে, কিন্তু সহমর্মিতার নম্বর নেই। পেশাগত দক্ষতার মূল্যায়ন আছে, কিন্তু পারিবারিক দায়িত্ববোধের মূল্যায়ন নেই।
ফলাফল হলো, আমরা ক্রমশ দক্ষ মানুষ পাচ্ছি, কিন্তু মানবিক মানুষ কম পাচ্ছি।
অনেকে বলেন, পশ্চিমা সমাজের প্রভাবে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। আবার অনেকে বলেন, উচ্চশিক্ষা মানুষকে পরিবার থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা এত সরল নয়।
ইউরোপে বা উত্তর আমেরিকায় এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা শত ব্যস্ততার মধ্যেও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেন। আবার আমাদের সমাজেও উচ্চশিক্ষিত না হয়েও অনেক সন্তান বাবা-মায়ের প্রতি চরম অবহেলা করে।
অতএব সমস্যার মূল শিক্ষা নয়, পশ্চিমা সংস্কৃতিও নয়।
সমস্যার মূল হলো মূল্যবোধের ঘাটতি।
একটি শিশুকে যদি ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে মানুষের মর্যাদা পদমর্যাদার চেয়ে বড়, সম্পর্ক অর্থের চেয়ে মূল্যবান, আর বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব কোনো দয়া নয় বরং কর্তব্য, তাহলে সে পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, নিজের শিকড় ভুলে যাবে না।
আমরা সন্তানকে ইংরেজি শেখাই, কম্পিউটার শেখাই, কোচিং করাই, বিদেশে পাঠাই। কিন্তু কয়জন তাকে শেখাই বৃদ্ধ মানুষের একাকীত্ব কেমন হয়?
কয়জন শেখাই, একদিন আমরাও বুড়ো হব?
সমাজের জন্য বার্তাটি তাই খুব সরল।
সন্তানকে অবশ্যই শিক্ষিত করুন। উচ্চশিক্ষিত করুন। পৃথিবী দেখান। বিদেশে পাঠান। বড় স্বপ্ন দেখতে শেখান।
কিন্তু তার আগে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে তাকে মানুষ হতে শেখান।
কারণ সচিব, অধ্যাপক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা প্রবাসী হওয়া জীবনের পরিচয় হতে পারে; কিন্তু মানবিক সন্তান হওয়াই মানুষের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
যে সমাজে বৃদ্ধ বাবা-মা নিঃসঙ্গ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান, সেই সমাজের উন্নয়নের পরিসংখ্যান যত উঁচুই হোক, সেখানে কোথাও না কোথাও মানবিকতার ঘাটতি রয়ে গেছে।
আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় পাঠ তাই হয়তো এটাই:
" শুধু সফল হওয়ার শিক্ষা নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাও দিতে হবে। কারণ ডিগ্রি মানুষকে বড় করে, কিন্তু মূল্যবোধ মানুষকে মহৎ করে।"