ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান গত সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় এক আকস্মিক পরিদর্শনে নামেন। জননিরাপত্তা ও নগর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে গাড়ি চালিয়ে পুরো এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করেন। এই পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল হকার উচ্ছেদের পরবর্তী পরিস্থিতি, এলাকাটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা। সরেজমিনে পরিদর্শনকালে তিনি লক্ষ্য করেন যে, হকার উচ্ছেদ করা হলেও কিছু স্থানে এখনো অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ সচল রয়েছে, যা অগ্নিঝুঁকি ও বিদ্যুৎ চুরির মতো গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শামিল। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এই অবৈধ সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন অনিয়ম পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন।
দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর-১০ এলাকাটি হকারদের দখলে থাকায় সাধারণ পথচারীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল। হকারদের অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পর বর্তমানে এলাকাটির দৃশ্যপট কিছুটা পরিবর্তিত হলেও সেখানে অব্যবস্থাপনার ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্ছেদের নামে সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগের মতো সেবাগুলো সঠিকভাবে তদারকি না করায় স্থানীয় একটি চক্র অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান পরিদর্শনকালে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেন এবং ফুটপাতমুক্ত এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জনদুর্ভোগ লাঘবে সিটি করপোরেশনের গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপকে টেকসই করতে হবে, অন্যথায় উচ্ছেদ কার্যক্রমের কোনো সুফল নগরবাসী ভোগ করতে পারবে না। বিশেষ করে মেট্রোরেল সংলগ্ন এলাকার অবকাঠামো সুরক্ষায় এবং পোস্টার-লিফলেটমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে তিনি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
পরিদর্শনকালে ডিএনসিসি প্রশাসক মিরপুর-১০ থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলার ও আশপাশের দেয়ালে থাকা অবৈধ পোস্টার ও লিফলেট অপসারণ পরবর্তী গ্রাফিতি অঙ্কনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। তিনি ড্রেন সংস্কার, ডাস্টবিন স্থাপন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণের ওপর জোর দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসকের এই আকস্মিক পরিদর্শনের ফলে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বরত কর্মীদের মধ্যে জবাবদিহিতার একটি বার্তা পৌঁছেছে। তবে স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, শুধুমাত্র মধ্যরাতের পরিদর্শন নয়, বরং নিয়মিত তদারকি ও তড়িৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণই পারে মিরপুর এলাকার দীর্ঘস্থায়ী এই বিশৃঙ্খলা নিরসন করতে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরীর প্রতিটি জোনে পর্যায়ক্রমে এমন নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হবে যাতে নাগরিক সেবার মান নিশ্চিত হয় এবং অবৈধ স্থাপনা পুনর্নির্মাণ রোধ করা সম্ভব হয়।
এই পরিদর্শনের মাধ্যমে মিরপুর-১০ এলাকার নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন করে গতি সঞ্চারের প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে যানজট নিরসন ও ফুটপাত উদ্ধারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও দখলদারিত্বের চক্র ভাঙতে পারলে কেবল তখনই মিরপুর-১০ এলাকাটি একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। প্রশাসকের এই কঠোর অবস্থান নগরবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে এই স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল নগরী গড়ার এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে তা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনে এক আমূল পরিবর্তন বয়ে আনবে।