রাজধানীর খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট গত কয়েক দিনে প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের চাহিদায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, পলাশী ও কল্যাণপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজার সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক কম পরিমাণ বোতলজাত তেল সরবরাহ করছে। এই সুযোগে বাজারে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারপ্রতি ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় ঠেকেছে। ব্রয়লার মুরগি ও মাছের দাম আগের মতোই আকাশচুম্বী থাকায় বাজারের এই সামগ্রিক অস্থিরতা নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই দফায় দফায় সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর যে কৌশল কোম্পানিগুলো গ্রহণ করেছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পণ্য না পাওয়ার কারণে তারা গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেক বিক্রেতা অভিযোগ করেছেন যে, কোম্পানিগুলো তেলের দাম আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ডিলাররা পরিষ্কারভাবে দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যার ফলে তারা পণ্য মজুদ করে রাখছেন। বিক্রেতারা বাধ্য হয়ে নিয়মিত গ্রাহকদের জন্য কিছু বোতল আলাদাভাবে সংরক্ষণ করছেন, যা বাজারে কৃত্রিম সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ভুক্তভোগী ক্রেতারা বলছেন, বাজারে ডিমের হালি ৫৫ টাকায় পৌঁছানো এবং ব্রয়লার মুরগির কেজি দীর্ঘদিন ধরে ২০০ টাকার আশেপাশে স্থিতিশীল থাকায় প্রোটিনের উৎস হিসেবে সাধারণ মানুষের যেটুকু ভরসা ছিল, তাও এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারের নিরাপত্তারক্ষীসহ স্বল্প আয়ের মানুষরা জানিয়েছেন, তাদের সীমিত আয়ে এখন পরিবারের মৌলিক পুষ্টির জোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্যসচিবের কাছে দাম বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক চিঠি দিলেও সরকার তা যাচাই-বাছাই ছাড়া কার্যকর করতে নারাজ। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক দাবির মুখে সরকার তেলের দাম বাড়াবে না। তবে সরকারি এই আশ্বাসের পরেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ডিলার ও কোম্পানিগুলোর এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক নজরদারি বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের জোরালো অভিযান না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার একই কৌশলে বাজার অস্থিতিশীল করার সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তা প্রমাণ করে যে বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বর্তমানে যথেষ্ট নয়।
বাজারের এই অস্থিরতা শুধুমাত্র একটি পণ্যের সংকট নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক সরবরাহ চেইন ও ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। দফায় দফায় তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। যদি অবিলম্বে অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় এবং বাজারে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে নিত্যপণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। ভোজ্যতেল ও প্রোটিনজাত পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য শুধুমাত্র সরকারি ঘোষণা যথেষ্ট নয়, বরং বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।