নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় নবম শ্রেণির এক মাদরাসাছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ এবং এর ফলে কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়ার চরম ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত ২৯ মার্চ ভুক্তভোগীর মা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করলেও ঘটনার ছয় মাস পার হওয়ার পরেও অভিযুক্ত মো. রাহাতুলকে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এজাহার অনুযায়ী, সহেলাপাড়া গ্রামের সৌদি প্রবাসী আব্দুল হেলিমের ছেলে রাহাতুল ওই কিশোরীকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। গত ২৫ মার্চ কিশোরীর শারীরিক অসুস্থতা ধরা পড়ার পর ৪ এপ্রিল নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে পরীক্ষার মাধ্যমে তার প্রায় ১২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। বর্তমানে ভুক্তভোগী কিশোরী প্রায় আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে, যা স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগীর পরিবার এবং স্থানীয় সূত্রের দাবি, মামলা দায়েরের পর থেকে অভিযুক্ত রাহাতুল আত্মগোপনে চলে গেছেন এবং পরিবারকে নানাবিধ হুমকি প্রদান করছেন। ভুক্তভোগীর মা নাছিমা আক্তার অভিযোগ করে জানান, থানায় প্রথমবার অভিযোগ জানাতে গেলে কোনো সুরাহা না পাওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু দীর্ঘ ছয় মাসেও মামলার তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন চরম অসহায়ত্বের সম্মুখীন। স্থানীয়ভাবে সালিশের নামে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে বলে ভুক্তভোগীর পরিবার জানিয়েছে। ধর্ষণের শিকার কিশোরী বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, অথচ অপরাধী ধরা না পড়ায় ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী কিশোরীর ভবিষ্যৎ এবং তার অনাগত সন্তানের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্ত রাহাতুলের মা কহিনূর বেগম মামলাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় সালিশে মীমাংসার নামে তাদের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল এবং সেই টাকা না দেওয়ার কারণেই এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এই দাবিকে ভুক্তভোগীর পরিবার সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্যামগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোহাম্মদ সেন্টু মিয়া জানিয়েছেন, মামলাটি পূর্বধলা থানা থেকে বর্তমানে তাদের তদন্ত কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে পুলিশের এই নিয়মিত 'চেষ্টা চলমান' থাকার মন্তব্যে ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে কোনো স্বস্তি ফিরছে না, বরং তদন্তে অবহেলার অভিযোগটি আরও জোরালো হচ্ছে।
একটি স্পর্শকাতর এবং গুরুতর অপরাধের ঘটনায় দীর্ঘ ছয় মাস অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও কোনো আইনি সুরাহা না পাওয়া বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব থাকুক কিংবা না থাকুক, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত করা না হয়, তবে এটি সমাজে অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করবে। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার এখন কেবল প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং অভিযুক্ত রাহাতুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে, যাতে করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।