চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের মৌলানা গ্রাম থেকে নিখোঁজ হওয়ার ১২ দিন পর নুপুর আক্তার নামক এক গৃহবধূকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রবাসী মোস্তফা কামালের স্ত্রী নুপুর গত ১২ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে আকস্মিকভাবে নিজ শ্বশুরবাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। এই ঘটনায় ১৬ অক্টোবর তাঁর মা ডেইজি আক্তার দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ৪৬৯) দায়ের করলে ঘটনার তদন্তে নামে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রযুক্তিগত সহায়তায় নুপুরের মোবাইল ফোনের অবস্থান গাজীপুরের ভাসান এবং পরবর্তীতে কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার দীর্ঘসূত্রতা এবং একাধিকবার অবস্থান পরিবর্তনের কারণে উদ্ধার অভিযানে বেগ পেতে হয় পুলিশকে। অবশেষে ২২ অক্টোবর দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের একটি চৌকস দল এবং ডিবি পুলিশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে তাঁর মায়ের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।
নুপুরের নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ১৮ অক্টোবর নুপুরের শাশুড়িকে কেন্দ্র করে তাঁর বাবার বাড়ির স্বজনদের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার যে অভিযোগ ওঠে, তা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে ৯৯৯-এ সহায়তা চাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। উদ্ধার পরবর্তী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুপুর আক্তার দাবি করেছেন যে, পারিবারিক মান-অভিমানের জেরে তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছিলেন এবং পরিচিত এক বান্ধবী ও পুরুষ বন্ধুর সহায়তায় গাজীপুরে আত্মগোপন করেছিলেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে কেন তিনি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন এবং তাঁর নেপথ্যে অন্য কোনো প্ররোচনা বা কোনো চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিলাল উদ্দীন জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নুপুরের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালিয়েছে। একাধিকবার স্থান পরিবর্তনের কারণে অভিযানগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও ডিবি পুলিশের সহায়তায় তাঁকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়। নুপুরের মা জিডি প্রত্যাহার করায় তাঁকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যদিও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুপুর স্বেচ্ছায় বাড়ি ছাড়ার কথা স্বীকার করেছেন, তবুও ঘটনার নেপথ্যে কোনো অশুভ চক্রের হাত রয়েছে কি না বা অন্য কোনো অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ এখন এই ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নজরদারি জোরদার করেছে।
নুপুর আক্তারের ফিরে আসার মাধ্যমে ঘটনার একটি অধ্যায়ের আপাত সমাপ্তি ঘটলেও, নিখোঁজ থাকার ১২ দিনের পুরো ঘটনাপ্রবাহ জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পারিবারিক কলহের জেরে এমন আকস্মিক অন্তর্ধান এবং পরবর্তীতে উদ্ধার হওয়ার বিষয়টি গ্রামীণ জনপদে সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক সংহতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উন্মোচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে, এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনায় ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি নিরসনে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তদন্তের পরবর্তী ধাপগুলোই চূড়ান্তভাবে পরিষ্কার করবে নুপুরের এই নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে প্রকৃত সত্য কী ছিল।