সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ ও অমানবিক চিত্র। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আদালতের নিকট যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন, তাতে দেখা যায় মরিয়ম খাতুনকে ন্যাম ভবনে সংসদ সদস্যের শয়নকক্ষের বারান্দায় রাত কাটাতে হতো। গত সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই দফায় আট দিনের রিমান্ড শেষে গাজী নজরুল ইসলামকে হাজির করা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এই তথ্য প্রকাশ করেন। মূলত ১৭ জুন ধর্মীয় রীতিতে বিয়ের পর নিজ এলাকায় কাবিন রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলেও ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে মরিয়মের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অবমাননাকর। সংসদ সদস্যের প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলামও একই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন এবং সেই সুবাদেই মরিয়মকে শয়নকক্ষের ভেতরে জায়গা না দিয়ে বারান্দায় ঘুমাতে বাধ্য করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। আদালত শুনানি শেষে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী মরিয়ম খাতুনের পারিবারিক সূত্র ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, সংসদ সদস্যের সঙ্গে মরিয়মের সম্পর্কের শুরুটা ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বিতর্কিত। মরিয়ম সম্পর্কে নজরুলের নাতনি এবং মামলার বাদী সম্পর্কে তার ভাগ্নে হওয়া সত্ত্বেও এই বিয়ের ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নজরুল ইসলাম ঢাকায় অবস্থানকালীন বাদীর বাসায় রাত্রিযাপন করতেন এবং সেই সুবাদেই মরিয়মের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তবে বিয়ের পর ন্যাম ভবনে নিয়ে আসার পর মরিয়মের জীবন একপ্রকার বন্দিদশায় পরিণত হয়। প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের উপস্থিতিতে মরিয়মকে শয়নকক্ষের বাইরে বারান্দায় ঘুমানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল পারিবারিক কলহ নয় বরং ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একজন নারীর অধিকার লঙ্ঘনের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মরিয়মের বাবা কর্তৃক দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার নেপথ্যে এই অমানবিক জীবনযাপনই মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের বিপরীতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা এবং ন্যাম ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে আসামি তার কৃতকর্মের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলো তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। যদিও সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ন্যাম ভবনের মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটে এমন অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নজরদারির অভাবকেই নির্দেশ করে। ভুক্তভোগী মরিয়মের পরিবার এখন এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে আসছে এবং মামলার তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এই ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী মহলে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির এক নির্মম প্রতিফলন। একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত জীবনে এমন অমানবিক আচরণ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য একটি বড় ধরনের নেতিবাচক বার্তা বহন করছে। সংসদ সদস্যের মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে পারিবারিক জীবনে এমন বিশৃঙ্খলা এবং স্ত্রীর প্রতি অমানবিক আচরণ কেবল আইনত অপরাধই নয়, বরং নৈতিক স্খলনেরও চরম পর্যায়। মরিয়মের এই করুণ পরিণতি পরিবহন এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে কর্মরতদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে ন্যাম ভবনের মতো রাষ্ট্রীয় আবাসনে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে।