আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি পরিবারের দোরগোড়ায় ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। মঙ্গলবার রংপুরে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে আরও বিস্তৃত করা, যেখানে রাষ্ট্রপতি পরিবারের সদস্যরাও এই কার্ডের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না। মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনকে সুসংহত করার লক্ষ্যেই এই ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পকে জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সকল কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বলে তিনি জানান। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় ধরনের মেলবন্ধন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতে বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকলেও, এবার শতভাগ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণাটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে সঠিক সময়ে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া এবং কার্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। স্থানীয় পর্যায়ের সুবিধাভোগীরা মনে করছেন, শুধুমাত্র কার্ড প্রদানই যথেষ্ট নয়, বরং কার্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং প্রকৃত অভাবী মানুষ যাতে তালিকাভুক্ত হয় তা নিশ্চিত করাই হবে মূল সফলতা। কোনো অবস্থাতেই যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তালিকা প্রণয়ন না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারির দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিরতা ও ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ কর্মসূচির কড়া সমালোচনা করেছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি দাবি করেন, তেলের সংকটের কথা বলে যারা লংমার্চ করছে, তাদের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ নয় বরং বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব হলে বিএনপি অনেক আগেই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত এমন কর্মসূচি পালন করত। বিরোধী পক্ষকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে বা অহেতুক কর্মসূচি দিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। পাশাপাশি তিনি রংপুরের বীর শহীদ আবু সাঈদ ফাউন্ডেশনের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন, যার মাধ্যমে আবু সাঈদের পরিবারের জন্য বাড়ি নির্মাণ এবং তার কবরস্থানের সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। এই আর্থিক অনুদান প্রদানকে স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেখছে মন্ত্রণালয়, যা শহীদ পরিবারের প্রতি সরকারের সহানুভূতি ও স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের এই মহাপরিকল্পনা সফল হলে দেশের অর্থনীতিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। তবে চার বছরের এই দীর্ঘ মেয়াদে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সেবা প্রদান নিশ্চিত করাই হবে সরকারের মূল পরীক্ষা। পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় এই কার্ডগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে। যদি সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই কার্ডগুলো প্রকৃত মানুষের হাতে পৌঁছায়, তবে তা দেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকি বজায় থাকলে এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।