জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বারবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আটকে যাওয়ার ঘটনা, যা ২০২৩ সাল...

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বারবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আটকে যাওয়ার ঘটনা, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের প্রথম মাসগুলো পর্যন্ত একাধিকবার ঘটেছে, তা আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে গভীর বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টত প্রশ্ন তুলছে: আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে যে প্রতিবন্ধকতা দেখা যাচ্ছে, তা কি বিভিন্ন দেশের নীতি প্রণেতাদের কৌশলগত ব্যর্থতা, নাকি স্বয়ং জাতিসংঘের কাঠামোগত দুর্বলতা এর জন্য দায়ী? গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ যখন তীব্র হচ্ছে, তখন এই মৌলিক প্রশ্নটির একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অপরিহার্য, যা বিশ্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মানবতাকে রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক আইন এবং নিরাপত্তা পরিষদ, যা সম্মিলিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আইন প্রয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর (P5) ভেটো ক্ষমতা, যা জাতিসংঘ সনদের ২৭ অনুচ্ছেদের ৩ নং ধারায় প্রদত্ত, প্রায়শই এই সম্মিলিত উদ্যোগকে পঙ্গু করে দেয়। ভেটোর মূল ধারণা ছিল, বড় শক্তিগুলোর ঐকমত্য ছাড়া কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, যাতে নতুন করে বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো যায়। তবে বাস্তবে, এটি প্রায়শই জাতীয় স্বার্থের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়া, ইউক্রেন বা সম্প্রতি গাজার ক্ষেত্রে, ভেটোর ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, যার ফলে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই কাঠামোগত ত্রুটি, যা সনদের গভীরে প্রোথিত, নীতির ব্যর্থতার চেয়েও সিস্টেমের মৌলিক দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে।

কেবল নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোই নয়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং তার বাস্তবায়নও প্রায়শই জাতীয় স্বার্থের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে। যদিও প্রতিটি দেশ জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশন (যেমন জেনেভা কনভেনশন, রোম স্ট্যাটিউট) অনুমোদন করে, তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায়শই দেশের ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে এই চুক্তিগুলো সম্পূর্ণরূপে মেনে চলতে ব্যর্থ হয়। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (ICJ) বা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ICC)-এর রায় বা নির্দেশিকাগুলো আইনত বাধ্যতামূলক হলেও, সেগুলোর প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছা এবং নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা সিস্টেমের দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, কারণ আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে কোনো স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাহী ক্ষমতা নেই। আঞ্চলিক সংস্থা, যেমন সার্ক (SAARC) বা বিমসটেক (BIMSTEC) এর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। এই সংস্থাগুলো আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন প্রায়শই তাদের কার্যকারিতাকে সীমিত করে। উদাহরণস্বরূপ, বিমসটেক তার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধিতে জোর দিলেও, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা সীমান্ত বিরোধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে এখনো পর্যন্ত সীমিত সাফল্য দেখিয়েছে, যা বৈশ্বিক স্তরে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার প্রবণতারই প্রতিচ্ছবি।

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও জটিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় অভিনেতাদের পাশাপাশি অ-রাষ্ট্রীয় অভিনেতাদের (যেমন জঙ্গিগোষ্ঠী, বহুজাতিক কর্পোরেশন) উত্থান এবং সাইবার যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী ইত্যাদির মতো নতুন ধরনের হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। আন্তর্জাতিক আইন মূলত রাষ্ট্র-কেন্দ্রিক হওয়ায়, এই নতুন হুমকিগুলো মোকাবেলায় প্রায়শই অপ্রতুল প্রমাণিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলায় প্যারিস চুক্তি থাকলেও, এর বাস্তবায়ন এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি প্রায়শই জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে গৌণ হয়ে যায়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping Operations), যা বিশ্বজুড়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদান রাখে, প্রায়শই দুর্বল ম্যান্ডেট, সীমিত সম্পদ এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য অর্জন করতে পারে না। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়মিতভাবে সৈন্য ও পুলিশ পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই মিশনগুলোর সাফল্য নির্ভর করে নিরাপত্তা পরিষদের সুস্পষ্ট ও কার্যকর ম্যান্ডেটের উপর, যা ভেটো ক্ষমতার কারণে প্রায়শই আপসকৃত হয়। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক আইন এবং এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল নীতি প্রণেতাদের সিদ্ধান্তই নয়, বরং সমগ্র সিস্টেমের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ, যা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় একটি মৌলিক সংস্কারের দাবি রাখে।

প্রতিষ্ঠানের নাম সূচক/বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট তথ্য/পরিসংখ্যান সময়কাল/তারিখ
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রয়োগ রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ) ১২০+ বার, যুক্তরাষ্ট্র ৮০+ বার, যুক্তরাজ্য ৩০+ বার, ফ্রান্স ১৮+ বার, চীন ১৮+ বার ১৯৪৬-২০২৩
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) শীর্ষ ৫টি সৈন্য প্রেরণকারী দেশ বাংলাদেশ (৭,২৭৯ জন), নেপাল (৬,২৪৫ জন), ভারত (৬,০৯৭ জন), রুয়ান্ডা (৫,৯১৮ জন), পাকিস্তান (৪,৩৩৫ জন) ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত
জাতিসংঘের বাজেট নিয়মিত বাজেট (মূল্যায়নকৃত অবদান) ৩.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ২০২৪ সাল
BIMSTEC সদস্য দেশ ৭টি (বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান, নেপাল) প্রতিষ্ঠা: ১৯৯৭

উৎস: জাতিসংঘ ডকুমেন্টস, UN Peacekeeping Statistics, SIPRI, BIMSTEC Secretariat.

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ সনদের ২৭ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা সীমিত করা উচিত। বিশেষ করে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে, সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে ভেটো বাতিল করার বিধান চালু করা যেতে পারে। এটি নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে এবং জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের পথ সুগম করবে।
  • ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (ICJ)-এর রায় বাস্তবায়নে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো-প্রভাবিত নিষ্ক্রিয়তা এড়াতে, 'Uniting for Peace' রেজোলিউশনের মতো প্রক্রিয়া ব্যবহার করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে (UN General Assembly) বিকল্প প্রয়োগকারী ক্ষমতা প্রদান করা উচিত। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদ অকার্যকর হলে সাধারণ পরিষদ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ICJ-এর রায় কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে পারবে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করবে।
  • আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC ও সার্ক-কে তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর সহযোগিতায় আঞ্চলিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে একটি স্বাধীন ও বাধ্যতামূলক সালিশি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসাহিত করা উচিত। এই ব্যবস্থা আঞ্চলিক সংঘাত প্রতিরোধে প্রাথমিক ভূমিকা পালন করবে এবং বৈশ্বিক সংস্থার উপর চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক স্তরে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator