স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সাম্প্রতিক প্রকাশিত 'বার্ষিক স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০২2' অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য ০.০৫ এর কম, যা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০১৮ এর লক্ষ্যমাত্রা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মানদণ্ড থেকে বহু যোজন দূরে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি গ্রামীণ জনপদে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের মধ্যে এক গভীর ফারাকের নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে নীতিমালার পাতায় সর্বজনীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ঝলমল করে, সেখানে বাস্তবের মাটিতে অধিকাংশ গ্রামীণ মানুষ আজও প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা থেকেও বঞ্চিত।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০১৮, যা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। এই নীতির অধীনে, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক এবং কাউন্সিলর নিয়োগের কথা বলা হয়েছে, এবং কমিউনিটি ক্লিনিক স্তরেও মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং ও রেফারেল ব্যবস্থা চালুর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এই নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত কর্মীদের শহরমুখী প্রবণতা এবং গ্রামীণ এলাকায় পদ সৃষ্টি ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অভাব এই উদ্যোগের সফলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। উদাহরণস্বরূপ, NIMH-এর একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের দ্বারা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় ৭০ শতাংশই শহুরে হাসপাতাল বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী, যা গ্রামীণ নিয়োগের ক্ষেত্রে বিরাট শূন্যতা তৈরি করেছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে মানসিক রোগের জন্য নির্দিষ্ট ঔষধের সরবরাহ অপ্রতুল এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক অনুমোদিত অত্যাবশ্যকীয় তালিকাভুক্ত ঔষধও হাতের কাছে পান না, ফলে চিকিৎসাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই বাস্তবতার আরেকটি বড় দিক হলো, গ্রামীণ জনপদে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কুসংস্কার। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামীণ সমাজে মানসিক অসুস্থতাকে প্রায়শই দৈবশক্তির প্রভাব বা জাদুবিদ্যা বলে মনে করা হয়, যার ফলস্বরূপ রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পেতে বিলম্ব করেন অথবা ভুল চিকিৎসার শিকার হন। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরাও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্তকরণে ও প্রাথমিক কাউন্সেলিং প্রদানে হিমশিম খান। এমনকি, যদি কোনো রোগী মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে রেফারেল পানও, দূরত্বের কারণে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার জন্য শহুরে কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না হওয়া এবং বিদ্যমান বাজেটও শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকা এই সমস্যার মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ধারণাকে স্বাভাবিক করার জন্য এবং কুসংস্কার দূরীকরণের জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রমের অভাবও প্রকট।
| সেবার ক্ষেত্র | শহুরে এলাকা (প্রতি ১ লাখ জনগোষ্ঠীতে) | গ্রামীণ এলাকা (প্রতি ১ লাখ জনগোষ্ঠীতে) |
|---|---|---|
| মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা | ১.২ | ০.০৫ |
| মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলরের সংখ্যা | ১.৮ | ০.০৮ |
| মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বাজেট বরাদ্দ (শতাংশ) | ৭৫% | ২৫% |
| অত্যাবশ্যকীয় মানসিক ঔষধের প্রাপ্যতা (শতাংশ) | ৮৫% | ৩৫% |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর সম্মিলিত প্রতিবেদন, ২০২২-২৩
সুপারিশ
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০১৮ এর অধীনে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কমপক্ষে একজন পূর্ণকালীন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক এবং দুইজন প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর নিয়োগের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে গ্রামীণ এলাকার সরকারি ও বেসরকারি ফার্মেসিগুলোতে অত্যাবশ্যকীয় মানসিক স্বাস্থ্য ঔষধের (যেমন – অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস, অ্যান্টিসাইকোটিকস) পর্যাপ্ত ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি ও বিতরণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এই ঔষধগুলোর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে হবে।
- রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) কে গ্রামীণ জনপদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নিয়মিত ও বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করে স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক চ্যালেঞ্জ এবং মানসিক অসুস্থতার প্রবণতা চিহ্নিত করতে হবে; স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কে সেই গবেষণা ফলাফলের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়নে এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে।