টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত

টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে প্রকাশিত বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC)-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে ৫জি নেটওয়ার্কের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রায় দুই বছর পরও এর কভারেজ দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ৭-১০% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ভিয়েতনাম একই সময়ে তাদের ৫জি নেটওয়ার্কের কভারেজ ৫০% এর বেশি সম্প্রসারিত করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার চিত্রই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরের পথে বিদ্যমান গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোর এক সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ৫জি কেবল দ্রুতগতির ইন্টারনেট নয়, এটি শিল্প ৪.০ (Industry 4.0), স্মার্ট সিটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক পরিষেবাগুলোর মেরুদণ্ড। এই সীমাবদ্ধতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

দেশের টেলিকম ও ইন্টারনেট অবকাঠামোর এই স্থবিরতার মূলে রয়েছে বেশ কিছু জটিল ও আন্তঃসংযুক্ত সমস্যা। প্রথমত, স্পেকট্রাম বরাদ্দ ও মূল্যের উচ্চতা। BTRC কর্তৃক নির্ধারিত স্পেকট্রামের উচ্চ মূল্য মোবাইল অপারেটরদের জন্য ৫জি অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অপারেটররা প্রায়শই অভিযোগ করে যে, এই উচ্চ মূল্য তাদের জন্য ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলস্বরূপ, সীমিত স্পেকট্রাম এবং উচ্চ অপারেশনাল খরচের কারণে বিদ্যমান নেটওয়ার্কের গুণগত মানও প্রায়শই প্রশ্নের মুখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো ভাগাভাগির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতি ও বাস্তবায়নের অভাব। যদিও নীতিগতভাবে অবকাঠামো ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে অপারেটরদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও পারস্পরিক টাওয়ার, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার সীমিত। এটি একই এলাকায় একাধিক অবকাঠামো তৈরির অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি করে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাস করে। এই অদক্ষতা গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, যেখানে ICT Division এর 'ইনফো-সরকার' প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলোও শেষ মাইল সংযোগের অভাবে পূর্ণ সুফল দিতে পারছে না।

এছাড়াও, এই খাতের উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের পরিবেশের দুর্বলতাও উল্লেখযোগ্য কারণ। ৫জি, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান বিস্তারের জন্য উচ্চ প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী, ডেটা বিজ্ঞানী এবং নেটওয়ার্ক স্থপতি প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে এই ধরনের বিশেষায়িত দক্ষতার অভাব প্রকট। BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) বহুবার স্থানীয় সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে এই দক্ষতার ঘাটতি পূরণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে উন্নত টেলিকম সরঞ্জাম বা সফটওয়্যার সমাধানের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। বিদেশী প্রযুক্তির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের কারণ, তেমনি স্থানীয় উদ্ভাবনী সক্ষমতাকেও পঙ্গু করে রাখছে। BHTPA (বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ) দেশের বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সচেষ্ট হলেও, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলের অভাব দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড কম্পিউটিং পরিষেবার মতো উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করছে, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো অপরিহার্য।

সূচক ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত) ২০২৪ (লক্ষ্য)
মোট ইন্টারনেট গ্রাহক (মিলিয়ন) ১২৯.৬ ১৩৪.৩ ১৪১.২ ১৫০.০
মোবাইল ইন্টারনেট স্পিড (Mbps) (গড়) ১০.৮ ১১.৫ ১১.৯ ২০.০
ফিক্সড ব্রডব্যান্ড স্পিড (Mbps) (গড়) ৩১.২ ৩৫.৫ ৩৮.৭ ৫০.০
৫জি কভারেজ (%) ০ (পরীক্ষামূলক) ৩.৫ ৭.০ ২৫.০

উৎস: BTRC বার্ষিক প্রতিবেদন, ICT Division এর বিভিন্ন প্রকাশনা ও Ookla Speedtest Global Index এর তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি।

সুপারিশ

  • BTRC-কে অবিলম্বে স্পেকট্রাম বরাদ্দ নীতি ও মূল্যায়নে সংস্কার আনতে হবে। অপারেটরদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ৫জি বিনিয়োগকে আকর্ষণীয় করতে স্পেকট্রামের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং অবকাঠামো ভাগাভাগি (Infrastructure Sharing) বাধ্যতামূলক করতে হবে। এক্ষেত্রে, টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত) এর আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করে সকল অপারেটরের জন্য টাওয়ার, ফাইবার অপটিক ও অন্যান্য কোর অবকাঠামো ভাগাভাগি বাধ্যতামূলক করা উচিত, যার ফলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস পাবে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে।
  • ICT Division এবং a2i-কে যৌথভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ৫জি, IoT, AI এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষায়িত কোর্স ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। BASIS-এর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই প্রোগ্রামগুলোর কারিকুলাম তৈরি ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, যা জাতীয় ডিজিটাল বাংলাদেশ নীতি ২০২১ এর লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে এবং স্থানীয়ভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করবে।
  • BHTPA-কে তার আওতাধীন সকল হাই-টেক পার্কে নিরবচ্ছিন্ন, উচ্চগতির এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক মানের ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড কম্পিউটিং পরিষেবা স্থাপনের জন্য অপরিহার্য। এর জন্য BHTPA সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট (IXP) স্থাপন করতে পারে, যা বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator