অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালের মে মাসে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বিমসটেক (BIMSTEC) শীর্ষ সম্মেলন আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংহতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, একই সময়ে সার্ক (SAARC)-এর ...

২০২২ সালের মে মাসে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বিমসটেক (BIMSTEC) শীর্ষ সম্মেলন আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংহতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, একই সময়ে সার্ক (SAARC)-এর ১৭তম শীর্ষ সম্মেলনের দীর্ঘসূত্রিতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা এবং এর অপ্রকাশিত সত্যগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। এক দশক ধরে সার্কের কার্যকারিতা প্রায় স্থবির হয়ে পড়া এবং বিমসটেকের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, এই অঞ্চলের দেশগুলোর পররাষ্ট্র নীতি (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)-এর অগ্রাধিকার ও কৌশলগত বিন্যাসের এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক মঞ্চে দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত অবস্থানকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।

সার্কের এই স্থবিরতা মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক অবিশ্বাস এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যু এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নিয়ে চলমান উত্তেজনা সার্কের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় বারবার বাধা সৃষ্টি করেছে। ২০০৭ সালের পর থেকে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল হয়ে যায়। এই অচলাবস্থা আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জনগণের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে সার্কের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে, সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলো বিকল্প আঞ্চলিক ফোরামের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে, যা বিমসটেকের মতো সংগঠনগুলোর উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। সার্কের মতো বৃহৎ পরিসরের সংগঠনের ব্যর্থতা, ছোট কিন্তু অপেক্ষাকৃত সমমনা দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত বিমসটেকের মতো প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকর করে তুলেছে, যেখানে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের সংমিশ্রণ ঘটে। এটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামোতে এক ধরনের 'মাল্টি-স্পিড' পদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে কিছু দেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে চায় এবং অন্যরা ধীরগতিতে চলে বা স্থবির থাকে।

বিমসটেক, অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের অভিন্নতার কারণে দ্রুত গতি লাভ করেছে। ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কাকে একত্রিত করে বিমসটেক বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার উপর জোর দিচ্ছে। ২০২২ সালের কলম্বো সম্মেলনে, বিমসটেক সনদ গ্রহণ এবং পরিবহন সংযোগের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান অনুমোদন করা হয়, যা আঞ্চলিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিমসটেকের এই সক্রিয়তা ভারতের 'লুক ইস্ট' এবং 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। একই সাথে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এই অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে নিজেদের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে, বিমসটেক কেবল একটি অর্থনৈতিক ফোরাম নয়, বরং এটি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করছে, যেখানে সদস্য দেশগুলো নিজেদের সমুদ্র নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগ্রহী।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে UN Peacekeeping মিশনে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অবদান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও ভারত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই অংশগ্রহণ কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে তাদের অঙ্গীকারই প্রতিফলিত করে না, বরং তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'সফট পাওয়ার' টুল হিসেবেও কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ তার সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে UN Peacekeeping মিশনে নিয়মিতভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য প্রেরণ করে, যা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। এই মিশনগুলোতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো কেবল নিজেদের পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করে না, বরং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকা, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বৈশ্বিক মঞ্চে একটি সম্মানজনক অবস্থান অর্জনে সহায়তা করে এবং তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দেয়। এটি একই সাথে আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরার একটি কৌশলগত উপায় হিসেবেও কাজ করে।

দেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য ও পুলিশ সদস্যের সংখ্যা (২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আনুমানিক) জাতিসংঘের মোট শান্তিরক্ষী বাহিনীর শতকরা অংশ (আনুমানিক)
বাংলাদেশ ৭,৩০০+ ৯.৫%
নেপাল ৫,৮০০+ ৭.৫%
ভারত ৫,৫০০+ ৭.২%
পাকিস্তান ৪,২০০+ ৫.৫%

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) পরিসংখ্যান, অক্টোবর ২০২৩।

সুপারিশ

  • সার্কের স্থবিরতা কাটাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে একটি 'দ্বি-ট্র্যাক' কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রথম ট্র্যাক হিসেবে, সার্কের অধীনে বিদ্যমান বিতর্কিত বিষয়গুলো বাদ দিয়ে কেবল অ-রাজনৈতিক, জনকল্যাণমূলক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে (যেমন - স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা) দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প চিহ্নিত করে 'সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফান্ড'-এর মাধ্যমে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় ট্র্যাক হিসেবে, 'সার্ক বিরোধ নিষ্পত্তি ফোরাম' (SAARC Dispute Resolution Forum) নামে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা কমিটি গঠন করতে হবে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিতর্ক সমাধানে স্বেচ্ছামূলক পরামর্শ ও সহায়তার প্রস্তাব দেবে।
  • বিমসটেকের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য, সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট 'বিমসটেক আঞ্চলিক বিনিয়োগ চুক্তি' (BIMSTEC Regional Investment Treaty) প্রণয়ন ও অনুসমর্থন করতে হবে। এই চুক্তিতে আঞ্চলিক বাণিজ্য উদারীকরণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং শুল্ক-বহির্ভূত বাধা অপসারণের জন্য স্পষ্ট নীতি ও আইনি কাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা ২০২৫ সালের মধ্যে কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
  • দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর UN Peacekeeping মিশনে সম্মিলিত সক্ষমতা আরও বাড়াতে, 'দক্ষিণ এশীয় শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' (South Asian Peacekeeping Training Centre) নামে একটি আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। এই কেন্দ্রটি জাতিসংঘের নির্দেশিকা অনুযায়ী সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম মানোন্নয়ন এবং কৌশলগত সমন্বয় সাধনে কাজ করবে, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator