অটোমেশনের শ্রমবাজার: বাংলাদেশের প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অটোমেশনের শ্রমবাজার: বাংলাদেশের প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

সাব্বির আহমেদ  avatar   
সাব্বির আহমেদ
অটোমেশনের শ্রমবাজার: বাংলাদেশের প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ
অটোমেশনের শ্রমবাজার: বাংলাদেশের প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (BASIS) আয়োজিত 'স্মার্ট বাংলাদেশ: উদ্ভাবনী ভবিষ্যতের পথে' শীর্ষক এক সেমিনারে দেশের আইসিটি খাতের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের শ্র...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (BASIS) আয়োজিত 'স্মার্ট বাংলাদেশ: উদ্ভাবনী ভবিষ্যতের পথে' শীর্ষক এক সেমিনারে দেশের আইসিটি খাতের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অটোমেশনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে যে, আগামী দশকে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে প্রচলিত অনেক পেশা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে, যা বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একই সময়ে, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) তাদের বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে (যেমন কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক) রোবোটিক্স ও অটোমেশন শিল্পের বিকাশকে উৎসাহিত করলেও, এই নতুন শিল্পে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের তীব্র ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি সম্ভাব্য সংকটই নয়, বরং সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি অনন্য অর্থনৈতিক সুযোগও বটে, যেখানে শ্রমবাজারকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব।

বিশ্বজুড়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ঢেউ যেভাবে প্রতিটি শিল্প খাতকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রস্তুত পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ এবং এমনকি পরিষেবা খাত পর্যন্ত, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রয়োগ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। উদাহরণস্বরূপ, উৎপাদন শিল্পে রোবোটিক আর্মের ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, ত্রুটি কমাচ্ছে এবং ব্যয় হ্রাস করছে। বাংলাদেশে, যেখানে শ্রমঘন শিল্পগুলো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেখানে অটোমেশনের এই ঢেউ অনিবার্যভাবে শ্রমশক্তির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে পুনরাবৃত্তিমূলক এবং কম-দক্ষতার কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ICT Division-এর 'জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলপত্র' (National Artificial Intelligence Strategy) যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশে গুরুত্বারোপ করেছে, তবে এই কৌশলের বাস্তবায়ন ও অটোমেশন-প্রভাবিত শ্রমশক্তির পুনর্বিন্যাসের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য এটি একটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ: একদিকে বিদ্যমান শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দক্ষতা তৈরি করা। এই মুহূর্তে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমশক্তির অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সাথে জড়িত থাকা এবং তাদের প্রথাগত উৎপাদন পদ্ধতিতে অভ্যস্ততা, অটোমেশন গ্রহণের ক্ষেত্রে এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এর ফলে, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দ্রুত প্রসারে একটি বড় সংখ্যক শ্রমিক কর্মচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে যদি না তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন অপরিহার্য। BTRC (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) কর্তৃক ফাইভ-জি প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ডেটা কানেক্টিভিটির মানোন্নয়ন অটোমেশন শিল্পের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাইভ-জি'র কম ল্যাটেন্সি এবং উচ্চ ব্যান্ডউইথ শিল্প-কারখানায় IoT (ইন্টারনেট অফ থিংস) এবং রোবোটিক সিস্টেমের নির্বিঘ্ন পরিচালনার জন্য অত্যাবশ্যক। তবে, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারার মতো দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে। a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করলেও, রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চস্তরের দক্ষতার জন্য আরও নিবিড় ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রয়োজন। BHTPA-এর অধীনে গড়ে ওঠা হাই-টেক পার্কগুলো শুধুমাত্র বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্র না হয়ে, স্থানীয় তরুণদের জন্য অটোমেশন গবেষণাগার এবং উদ্ভাবনী হাব হিসেবেও কাজ করতে পারে। বর্তমানে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রোবোটিক্স ও অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কোর্স চালু হলেও, শিল্পের বাস্তব চাহিদা ও একাডেমিয়ার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সংযোগের অভাব রয়েছে। এই সংযোগ স্থাপন করতে পারলে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারবে এবং শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও সহায়তা করতে পারবে। তাছাড়া, ছোট ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে অটোমেশন প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক প্রণোদনা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই খাতই বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ ধরে রেখেছে।

খাত ২০২০ সালে অটোমেশন গ্রহণ হার (%) ২০২৫ সালের প্রাক্কলিত অটোমেশন গ্রহণ হার (%) দক্ষতা ঘাটতির প্রাক্কলন (২০২৫)
প্রস্তুত পোশাক শিল্প (RMG) ১৫% ৪০% উচ্চ
উৎপাদন শিল্প (নন-RMG) ১০% ৩৫% উচ্চ
ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা ২০% ৫০% মধ্যম
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ৫% ২৫% উচ্চ
স্বাস্থ্যসেবা ৮% ৩০% মধ্যম

উৎস: বাংলাদেশ সরকার, ICT Division ও বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন ও নীতি পর্যালোচনা (২০২০-২০২৩) থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে আনুমানিক চিত্র।

সুপারিশ

  • জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলপত্র (National Artificial Intelligence Strategy) এর আওতায় ICT Division-কে একটি সুনির্দিষ্ট 'অটোমেশন-প্রভাবিত শ্রমশক্তি রূপান্তর তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে BASIS-এর মতো শিল্প সমিতিগুলোর মাধ্যমে শিল্প-শ্রমিকদের রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স ও অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং টেকনিকসে পুনঃপ্রশিক্ষণ ও আপস্কিলিং কর্মসূচিতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে, যা আগামী ৫ বছরে অন্তত ১ লক্ষ শ্রমিককে নতুন দক্ষতায় সজ্জিত করবে।
  • BTRC-কে 'ফাইভ-জি রোলআউট ও স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট নীতি'-তে শিল্প-অটোমেশনের জন্য ডেডিকেটেড হাই-ব্যান্ডউইথ স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং শিল্প ডেটা সুরক্ষা প্রোটোকল কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর পাশাপাশি, BTRC-কে 'কানেক্টেড ম্যানুফ্যাকচারিং' (Connected Manufacturing) উদ্যোগের অধীনে শিল্প-কারখানাগুলোকে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে সহজ শর্তে লাইসেন্সিং ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান করতে হবে, যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত অটোমেশন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
  • a2i এবং BHTPA-কে যৌথভাবে 'স্কিলস ফর ফিউচার' কর্মসূচির অধীনে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কসহ অন্যান্য হাই-টেক পার্কগুলোতে রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স ও সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমসে বিশেষায়িত 'অ্যাডভান্সড টেক ল্যাব' স্থাপন করতে হবে। এই ল্যাবগুলোতে শিল্প-প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরি করে যুবকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রতি বছর অন্তত ২০,০০০ নতুন দক্ষ জনবল তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাব্বির আহমেদ

সাব্বির আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: রোবোটিক্স ও অটোমেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator