বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও অবহেলার দায়: ইতিহাসের প্রতি চরম উদাসীনতা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও অবহেলার দায়: ইতিহাসের প্রতি চরম উদাসীনতা..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও অবহেলার দায়: ইতিহাসের প্রতি চরম উদাসীনতা..
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও অবহেলার দায়: ইতিহাসের প্রতি চরম উদাসীনতা..
ছবি: সংগৃহীত
স্বাধীনতার মহান স্থপতি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘরের বেহাল দশা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আত্মত্যাগের যথাযথ উপস্থাপনার অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।..

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অনন্য বীর, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের আত্মত্যাগের ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তানের করাচির মশরুর বিমানঘাঁটি থেকে টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান ছিনতাই করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার দুঃসাহসী অভিযানে গিয়ে তিনি শহীদ হন। পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকরা তাঁকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে অবজ্ঞার সাথে সমাহিত করলেও, স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন। ২০০৬ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হলেও, তাঁর গ্রামের স্মৃতি জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধের বর্তমান অবস্থা জাতীয় বীরের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই স্থাপনাগুলোর জীর্ণ দশা এবং নথিপত্রের অযত্ন প্রমাণ করে যে, জাতীয় বীরের স্মৃতি রক্ষায় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের গ্রামের বাড়িতে নির্মিত স্মৃতি জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধে ব্যক্তিগত স্মারক ও ঐতিহাসিক নথিপত্র প্রদর্শনের যে ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, তা বর্তমানে চরম অবহেলার শিকার। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে স্থাপনাটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এটি তার আকর্ষণ ও গুরুত্ব হারাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই বীরের জীবন ও কর্ম তুলে ধরার যে লক্ষ্য ছিল, তা জাদুঘরের অব্যবস্থাপনার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দৃশ্যমান উপস্থাপনা বা তথ্যচিত্রের অভাব থাকায় তরুণরা এই বীরের আত্মত্যাগের গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ হচ্ছে। যে মানুষটি নিজের জীবনের বিনিময়ে জাতীয় পতাকা ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে সমুন্নত রাখতে চেয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিচিহ্নগুলোর এই করুণ দশা প্রকারান্তরে ইতিহাসের প্রতি আমাদের চরম উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্মৃতি সংরক্ষণের এই করুণ পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত সংস্কার কাজের যে আশ্বাস দেওয়া হয়, তা বাস্তবে রূপ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মতো জাতীয় বীরের স্মৃতি রক্ষায় শুধু সরকারি অনুদান বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনে নিবিড় গবেষণা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের একটি স্থায়ী কাঠামো প্রয়োজন। সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে এই স্থাপনাটির পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তিগত স্মারকগুলো যেন যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং দর্শনার্থীদের জন্য তা একটি শিক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান কেবল একটি নাম বা ইতিহাস বইয়ের একটি অধ্যায় নন, তিনি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর স্মৃতিসৌধের অবহেলা কেবল একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা নয়, এটি জাতির নৈতিক দায়িত্বের পরিপন্থী। যদি আমরা আমাদের বীরদের যথাযথ সম্মান ও তাদের স্মৃতিকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হই, তবে তা নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ম্লান করে দেবে। বাংলাদেশের আকাশ ও মাটিতে তাঁর আত্মত্যাগের যে অম্লান চিহ্ন রয়েছে, তা অটুট রাখতে হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সচেতনতা এবং দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ইতিহাসের এই জীবন্ত অধ্যায়কে যথাযথ মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমেই আমরা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারি।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator