খাগড়াছড়ির গুইমারায় সেনাবাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে হেফাজত ইসলাম সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক নিরাপত্তা বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতারা শনিবার ও রোববারের বিবৃতিতে খাগড়াছড়ির গুইমারায় সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে সংঘটিত সশস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, নিরাপত্তা ব্যূহ আরও শক্ত করা না হলে পার্বত্য অঞ্চল দ্রুত অসতর্ক ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে — যা দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
হেফাজত নেতাদের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে খাগড়াছড়ি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী উপদলগুলো জনগণের ওপর এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা বৃদ্ধি করেছে; নির্যাতন, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও তদ্ভব অপরাধের অভিযোগও বেড়েছে। তারা বলছেন, “ধর্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া দরকার” — একই সঙ্গে বিচার দাবিকে অজুহাত করে পাহাড়ি বাঙালি জনবসতি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।
হেফাজত নেতৃত্ব মনে করেন, ইউপিডিএফ (UPDF) মত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো ভারতভিত্তিক কিছু সহায়তা ও রাজনীতিক অনুপ্রবেশের ঝোঁক নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের সংগঠন শুধু রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ববিরোধী কর্মকাণ্ডেই লিপ্ত নয়; তারা নিয়মিতভাবে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও গুম-খুনের মতো অপরাধ করছে যার ফলে স্থানীয় বাঙালি ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী আতঙ্কগ্রস্ত।
নেতারা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, “ভূমিপুত্র বাঙালি ও পাহাড়ে বসবাসকারী সকল মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে”। তারা বিশেষভাবে জোর দেন যে, পাহাড়ি জনসমাজকে বিভক্ত করে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা ব্রতিহীন রাজনৈতিক চালাকি; এ ধরনের বিভাজন বিদ্বেষ ও সহিংসতার প্রবণতা বাড়ায়। তাই স্থানীয় শান্তি ও সহাবস্থানের জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত এক সুসংগঠিত কৌশল প্রয়োজন।
হেফাজত ইসলাম সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন — ইউপিডিএফ ও অন্যান্য চিহ্নিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে ঘোষণা করে কড়া নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হোক। তারা আরও দাবি করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র গ্রহণ করা সময়ের দাবি; যাতে করে সীমান্ত-সংলগ্ন অপছন্দনীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রুখে দেয়া যায়।
হেফাজতের বক্তব্যে একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যে—সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যথেষ্ট ধৈর্য ও সংযম দেখিয়েছে। তবু তারা বলেন, বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা, কৌশলগত বৃদ্ধি ও মানবসম্মত তদন্ত-অভিযান চালানোর সুযোগ দিতে হবে, যাতে করে অপরাধীচক্র দ্রুত দমন করা যায় এবং সাধারণ জনগণ নিরাপদ বোধ করতে পারে।
অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও সাম্প্রতিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নিরাপত্তা-অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন। স্থানীয় ফেরতদার ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, হামলা ও নাশকতার ভয়ে অনেকেই রাতেই বাড়ি বন্দী হচ্ছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে যাচ্ছেন; ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি ক্রমবর্ধমান। হেফাজতের বিবৃতিতে এই মানবিক ও অর্থনৈতিক দিক সম্বন্ধে আলোকপাত করে বলা হয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে স্বাভাবিক নাগরিকজীবন ফিরিয়ে আনার জন্য অবিলম্বে কার্যকর প্রশাসনিকতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিশ্লেষকরাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার মূল কড়ি কেবল নিরাপত্তা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সামাজিক পুনর্মিলন, ভূমি-স্বত্ব সংক্রান্ত শুদ্ধি, এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার মতো নীতি-নির্ধারণ জরুরি। কিন্তু হেফাজত ইসলাম যেখানে এখন সরাসরি সামরিক নিরাপত্তা জোরদারির ওপর জোর দিচ্ছে, সেটি সিলেকটিভ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে — বিশেষত যখন সশস্ত্র উপদলজনিত গোলযোগ তীব্র আকার ধারণ করছে।
হেফাজত নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন, সরকারি ও সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি দ্রুত মূল্যায়ন করে পদক্ষেপ নেবে; এবং নিরপেক্ষ, আইনি মেকানিজমে অভিযুক্তদের বিচারে দ্রুত ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা হবে। একই সঙ্গে তারা সরকারের প্রতি অনুরোধ রেখেছেন যাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলও প্রণয়ন করা হয়।
এখনকার পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজীবন, সীমান্ত-সংবেদনশীল সামরিক কৌশল ও স্থানীয় অর্থনীতির টিকে থাকার ওপর এই ধরনের সংঘর্ষ ও হামলার যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই রাজনীতিক মহল, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় নেতৃত্বদের মধ্যকার দ্রুত সমন্বয়ই কেবল বর্তমান উত্তেজনা লাঘবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
হেফাজতের এই দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে—তাহলে পার্বত্য অঞ্চলে সাময়িক নিরাপত্তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। তবে সমালোচকরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে সমস্যার মূলে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো অক্ষত থেকে যাবে; ফলে ভবিষ্যতে পুনরায় অশান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা থেকেই যাবে।
সর্বশেষ, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড, হেফাজতের বিবৃতি ও জনগণের উদ্বেগ — সবমিলিয়ে এই ইস্যুটি এখন জাতীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা ও সংহতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সঠিক কৌশল ও সময়োপযোগী উদ্যোগ না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচিত্রে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই যাবে।