নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনার জেরে গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ফতুল্লা মডেল থানা প্রাঙ্গণ। ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবৈধভাবে মাটি কাটার প্রতিবাদ করায় বক্তাবলী বাজার এলাকায় হামলার শিকার হন জেলা এনসিপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক তাওহীদুল ইসলামসহ অন্তত চারজন। এই ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে দলটির জেলা আহ্বায়ক যুবাইর সরদার থানার ভেতরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। ভাইরাল হওয়া ১৭ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজে তাকে বলতে শোনা যায়, আর কোনো কর্মীর গায়ে হাত তুললে লাশের বদলে লাশ নেওয়া হবে এবং থানার ইট-পাথর পর্যন্ত খুলে ফেলা হবে। সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনের উপস্থিতিতে একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী এনসিপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদের নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সন্ত্রাসী পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। আহত তাওহীদুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ঘটনার পর এনসিপির যুব উইংয়ের পক্ষ থেকে ১৬ জনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ভুক্তভোগীদের দাবি, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গড়িমসি করছে, যার ফলে সন্ত্রাসীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। যুবাইর সরদারের বিতর্কিত বক্তব্য মূলত দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রতি এক ধরনের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। তবে আইনের আশ্রয় নেওয়ার নামে থানায় ঢুকে এভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চার অংশ হতে পারে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম জানান, তিনি সরাসরি এ ধরনের বক্তব্য শোনেননি, তবে দায়িত্বশীল পদে থেকে থানার ভেতরে এ ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি এ ধরনের বক্তব্য আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত যুবাইর সরদার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে দাবি করেছেন যে, ভিডিওটি আংশিক এবং তিনি মূলত উত্তপ্ত নেতাকর্মীদের শান্ত করতেই এমন কথা বলেছিলেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশ ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করায় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রশমন করতে তিনি এমন কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। তবে সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের নেতৃত্বে থানায় যাওয়া এবং সেখানে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়, বরং এটি স্থানীয় পর্যায়ে আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের একটি নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে। থানায় দাঁড়িয়ে এ ধরনের হুমকি সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে নারায়ণগঞ্জের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনা হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং জননিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। রাজনৈতিক সংঘাতের এই সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনৈতিক নেতা থানায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে হুমকি দেওয়ার দুঃসাহস না দেখান।