বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ব্যঙ্গাত্মক রচনার এক অনন্য ধারার প্রবর্তক খন্দকার মোজাম্মেল হক আজ থেকে ছয় বছর আগে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয় পত্রিকার প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল সংবাদ পরিবেশন করেননি, বরং গেদুচাচা নামক এক কালজয়ী চরিত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকে তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার। আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন এবং বাংলা সাংবাদিকতায় তাঁর রেখে যাওয়া অসামান্য প্রভাবকে নতুন করে মূল্যায়ন করছেন। তাঁর সৃজনশীল লেখনী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতা তাঁকে সমসাময়িক অন্যান্য লেখকদের থেকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় আসীন করেছে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
খন্দকার মোজাম্মেল হকের সাংবাদিকতা ছিল মূলত গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন, যা তিনি অত্যন্ত সাবলীল আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগে ফুটিয়ে তুলতেন। গেদুচাচার খোলাচিঠির মাধ্যমে তিনি যে ধারার সূচনা করেছিলেন, তা কেবল বিনোদনের খোরাক ছিল না, বরং ছিল ক্ষমতার বারান্দায় সাধারণ মানুষের অসন্তোষের প্রতিধ্বনি। তাঁর পাঠকগোষ্ঠীর মতে, তিনি যখন লিখতেন, তখন মনে হতো যেন প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের মনের কথাগুলোই কাগজে উঠে আসছে। তাঁর এই লেখার শৈলী ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, যা রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদেরও আত্মপোলব্ধিতে বাধ্য করত। সেই সময়ের পাঠকের কাছে গেদুচাচা ছিল সত্যের প্রতীক, যার প্রতিটি চিঠিতে থাকত সমসাময়িক রাজনীতির অসংগতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা। আজকের ডিজিটাল যুগের দ্রুতগতির সাংবাদিকতায় যখন গভীর বিশ্লেষণের অভাব পরিলক্ষিত হয়, তখন মোজাম্মেল হকের মতো একজন ব্যক্তিত্বের অভাব আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁর সহকর্মীরা।
সংশ্লিষ্ট মহল এবং গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খন্দকার মোজাম্মেল হক ছিলেন একটি আস্ত প্রতিষ্ঠান, যিনি প্রতিকূল সময়েও সাংবাদিকতার নীতি ও আদর্শের সাথে আপস করেননি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা ধরনের চাপের মুখে থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। তাঁর এই সাহসী অবস্থান তৎকালীন সাংবাদিক সমাজে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও শুভানুধ্যায়ীরা আজ এই দাবি জানাচ্ছেন যে, তাঁর লেখা ও কর্মের সংগ্রহগুলো নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য পাঠ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব আজকের তরুণ সাংবাদিকদের জন্য কেবল শিক্ষণীয় নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তাঁর স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁর সৃষ্ট অনন্য ধারাটি টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর অনুসারীরা।
পরিশেষে, খন্দকার মোজাম্মেল হকের প্রয়াণ কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং বাংলা রাজনৈতিক সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন। তবে তাঁর সৃষ্ট ‘গেদুচাচা’ আজও পাঠকদের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছেন এবং রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। আধুনিক সাংবাদিকতার এই যুগে যখন সংবাদের গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন মোজাম্মেল হকের সাহসী ও গঠনমূলক লেখনী নতুন প্রজন্মের জন্য একটি ধ্রুবতারা হিসেবে কাজ করবে। তাঁর কর্মময় জীবনের আদর্শ অনুসরণ করে যদি আগামীর সাংবাদিকরা সত্য প্রকাশের সাহস সঞ্চয় করতে পারেন, তবেই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব হবে। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হলেও তাঁর রেখে যাওয়া লেখনীর প্রভাব আগামী বহু বছর বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অমলিন দলিল হয়ে থাকবে।
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।