সাগরে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ, হতাশায় ফিরছেন উপকূলের হাজারো জেলেপটুয়াখালী প্রতিনিধি:
দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের দেখা না পেয়ে চরম হতাশায় পড়েছেন পটুয়াখালীর গলাচিপা, দশমিনা, রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলার শত শত ট্রলার মালিক, হাজার হাজার জেলে, আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীরা। সাগর থেকে একের পর এক ট্রলার ফিরছে খালি অথবা অল্প মাছ নিয়ে। এতে যেমন লোকসানের মুখে পড়ছেন জেলেরা, তেমনি বাজারে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।
গত ১১ জুন সরকারের ঘোষিত ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ আহরণ নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ভালো মাছের আশায় জেলেরা গভীর সাগরে পাড়ি জমান। তাদের প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘ বিরতিতে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ঘটবে এবং সাগরে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের প্রাচুর্য দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।
জেলেদের মতে, একটি বড় ট্রলার নিয়ে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গেলে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন অবস্থান করতে হয়। প্রতিটি ট্রলারে ২০ থেকে ২৫ জন মাঝিমাল্লা থাকেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, বরফ, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য রসদ বাবদ প্রতিটি ট্রিপে ব্যয় হয় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। অথচ একটি ট্রিপ লাভজনক করতে অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি প্রয়োজন। কিন্তু এবার অনেক ট্রলারই খরচের টাকাও তুলতে পারেনি।
বাংলাদেশের অন্যতম সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ কেন্দ্র পটুয়াখালীর উপকূলীয় বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রলার ভিড়লেও নেই চিরচেনা কর্মচাঞ্চল্য। মাছ নামানোর ব্যস্ততা, আড়তদারদের হাঁকডাক এবং শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা অনেকটাই কমে গেছে। গলাচিপার পানপট্টি পাইকারি ও খুচরা মাছ বাজারেও মাছের সরবরাহ কম থাকায় ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে কয়েকগুণ। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এসব মাছ।
সমুদ্রগামী ট্রলারের মালিক মো. মিরাজ বলেন, “৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর বড় আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। ১২ দিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাইনি। বাধ্য হয়ে প্রায় খালি হাতেই ফিরে এসেছি। যে ট্রিপে আগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতাম, এবার সেখানে খরচের টাকাও ওঠেনি।”
অন্য ট্রলার মালিক মো. ইউসুফ বলেন, “নিষেধাজ্ঞার পর আশা ছিল সাগরে প্রচুর মাছ পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও কম মাছ মিলছে।”
গলাচিপার পানপট্টি মাছ বাজারের ব্যবসায়ী মো. রিয়াদ মৃধা জানান, “বিগত বছরগুলোতে ৫৮ দিনের অবরোধ শেষে সাগর ও উপকূলবর্তী নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে মাছ ধরা পড়লেও এ বছর এখনো পর্যন্ত তেমন মাছ ধরা পড়েনি। ফলে জেলেদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।”
গলাচিপার মদিনা ফিশের স্বত্বাধিকারী কুদ্দুস মুন্সী বলেন, “সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনে জেলেরা দীর্ঘ সময় কর্মহীন ছিলেন। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আশা ছিল নিষেধাজ্ঞা শেষে ভালো মাছ পাবেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখন ইলিশের ভরা মৌসুম, অথচ সাগরে মাছের দেখা মিলছে না। এতে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।”
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, “বর্ষাকাল হলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে জেলেরা প্রত্যাশিত মাছ পাচ্ছেন না। তবে এটি সাময়িক পরিস্থিতি হতে পারে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সাগরে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছি।”
উপকূলজুড়ে এখন জেলে, ট্রলার মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীদের একটাই প্রত্যাশা—সাগরে দ্রুত মাছের প্রাচুর্য ফিরে আসুক, ঘুরে দাঁড়াক উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি এবং স্বস্তি ফিরুক হাজারো জেলে পরিবারের জীবনে।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
সংবাদটির ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি করুন।