পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের জাতিগত পরিচয়ের ব্যাপার টা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রনয়ের সময় সকল আদিবাসীদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা মীমাংসায় যাওয়া দরকার ছিল কিন্তু সেটা তখন করা হয় নি বা করা সম্ভব ছিল না হয়তোবা।গণপরিষদের ৪০৪ জন সদস্যদের মধ্যো থেকে ৩৪ জন সদস্য নিয়ে সংবিধান প্রনয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছিল।৪০৪ জন সদস্যদের মধ্যো একজন ছিলেন মানবেন্দ্র লারমা যিনি আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
জাতীয়তাবাদ নিয়ে খসরা সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদে বলা ছিল বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত এই বাক্যোর পর আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া "বাংলাদেশের নাগরিকগন বাঙালী বলে পরিচিত হবেন"-এই মর্মে একটি সংশোধনী আনেন এবং ড.কামাল হোসেন এই সংশোধনী গ্রহনযোগ্য বলে অভিমত দেন তখন মানবেন্দ্র লারমা আপত্তি জানিয়ে বলেন:
"আমি একজন চাকমা।আমার বাপ,দাদা,চৌদ্দপুরুষ কেউ বলেন নাই,আমি বাঙালী।...আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়,তাহলে আমাদের এই চাকমক জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে।আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি।কিন্তু বাঙালী বলে নয়।"
তার আপত্তি সত্তেও সংশোধনী গৃহীত হয় এবং লারমা গনপরিষদের বৈঠক বর্জন করেন।
পরে মানবেন্দ্র লারমা ফিরে এসে ১৪ অনুচ্ছেদের পর ১৪ক নামে একটি নতুন অনুচ্ছেদ যোগ করার প্রস্তাব করেন।
(ক)ন্যায়সংগত অধিকার সংরক্ষণ করা হইবে
(খ)শিক্ষা,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মান উন্নয়নের জন্য বিশেষ অধিকার দেওয়া হইবে।
(গ)অনগ্রসর জাতিসমূহের সহিত সমান পর্যায়ে উন্নত হইবার পরিপূর্ণ নিশ্চযতা বিধান করিবেন।
আওমিলীগের সদস্যরা এটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ন এবং জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন পরে ডেপুটি স্পিকার লারমার প্রস্তাবকে বিধিবহির্ভূত ঘোষনা করেন।
মানবেন্দ্র লারমা এরপর ৪৭ক নামক নতুন একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার প্রস্তাব করেন।তিনি এতে উপজাতীয় অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক,অর্থসমাজিক ও ধর্মীয় সুরক্ষার জন্য একে সায়ত্তশাসতি অঞ্চল ঘোষনা করার প্রস্তাব দেন এবং এই বক্তব্যের সমর্থনে পার্বত্য চট্টগ্রামে দশটি ছোট ছোট জাতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
ড.কামাল হোসেন লারমার সংশোধনী অগ্রহনযোগ্য বলে অভিমত দেন এবং সংবিধানে সবার মানবধিকার ও অনগ্রসর নাগরিকদের জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে বলে আবারও লারমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
লারমা তখন বলেন,"মাননীয় স্পিকার সাহেব,ড.কামাল হোসেন সাহেব আমাকে আশ্বাস দিচ্ছেন এই বলে যে অনগ্রসরদের জন্য বিশেষ আইন করার বিধান রয়েছে সংবিধানে। কিন্তু এখন আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে,আজকে যে আওমীলীগ সরকার রয়েছে,সে আওমিলীগ সরকার সামনের নির্বাচনে অথবা পরবর্তী সময়ে যদি না আসে-যদি অন্য সরকার আসে.....স্পিকার লারমার বক্তব্য শেষ করতে দেয় নি,তনি লারমার বক্তব্য কে বাঙালী জাতীয়তাবাদবিরোধী এবং বিধিবহির্ভূত বলে ঘোষণা করেন।
লারমার তিনটি প্রস্তাবের প্রথম দুইটি যুক্তিযুক্ত হলেও তৃতীয় প্রস্তাব টি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী ছিল, সে যাই হোক সবগুলো প্রস্তাবনাকে একত্রিত করে আদিবাসীদের সাথে পরামর্শেে ভিত্তিতে যুক্তিসংগত মীমাংসা করতে পারলে আজকে এই সমস্যা হতো না।
মানবেন্দ্র লারমা সকল প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে পাহাড়ে ফিরে গিয়ে চরমপন্থী হয়ে ওঠেন এবং গঠন করে "শান্তি বাহিনী" নামক সসস্ত্র বাহিনী যার প্রশিক্ষন এবং অস্ত্রের যোগান ভারতের দ্বারা হতো এর পর থেকে যুদ্ধ লেগেই আছে যা এখনো চলমান।
জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট থাকাকালে উল্লেখযোগ্য তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন
(১)বাঙালী জাতীয়তাবাদ এর পরিবর্তে সংবিধানে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এর প্রবর্তন এর ফলে আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।
(২)বাঙালী এবং আদিবাসীদের মধ্যে মেলবন্ধনের জন্য ৩ লক্ষ বাঙালীকে পাহাড়ে স্থানান্তর করেন,আদিবাসীদের ভাষায় যারা সেটেলার।
(৩)পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড নামক একটি সরকারি সংস্থা গঠ করেন যার অর্থায়নের দায়িত্বে ছিল "এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।
কিন্তু তাতে তেমন একটা লাভ হয়েছে বলে আমার জানা নেই।জিয়াউর রহমান এর আমলেই সেনাবাহিনী পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং আদিবাসীদের সসস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযান জিয়াউর রহমানের আমলেই হয় এবং তিনি অনেকটা সফলতাও পান অভিযানের ফলে কিন্তু পাহাড়ে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্টা করা সম্ভব হয় নি।
১৯৯১ সালর গনতন্ত্র পুনুরাদ্ধের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খাালেদা জিয়া শান্তি আলোচনা শুরু করেন কিন্তু কোনো ফলাফল আসে নি এরপর ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরু হয় এবং আলোচনার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২ রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সাক্ষরিত হয়।সে চুক্তির দুই মাস পরে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল শান্তি বাহিনীর সদস্যরা।কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৪ এতোদিনের পরিক্রমায় পাহাড়ে কুকি চিন এর মতো আরও একাধিক সসস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে তারা এখন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতেছ তাদের দাবি ১৯৯৭ সালের চুক্তির সর্বমোট ৭০ টি অনুচ্ছেদ ছিল যার কিছুই নাকি সরকার বাস্তবায়ন করে নি।তারা চাচ্ছে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প গুলো পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য যেটা তারা বহুবছর থেকে বলে আসছে কিন্তু সরকার পাহাড়ের নিরাপত্তার স্বার্থে এটা করতে পারতেছেন না।
বছরখানিক আগে বাঙালী একজন যুবকের হত্যা কে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম আবারও উত্তাল সেখানে অনেক আদিবাসী সোসাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে পোস্ট দিয়েছিল যেটা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর হুমকিস্বরূপ সাথে সাথে তারা সেনাবাহিনী তুলে নেয়ারও দাবি যানাচ্ছে।তারা সেখানে আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সশস্ত্র ক্যাডারদের জড়ো করতেছে বাঙালী বিভিন্ন এলাকাতে সন্ত্রাসী আক্রমন চালানোর জন্য ইতিমধ্যে তারা সেটা শুরু করে দিয়েছে।
ভারত হয়তোবা এই বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিয়ে দেশকে উত্তাল করার জন্য আদিবাসীদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।আমরা ইতিপূর্বে লক্ষ করেছে যে শেখ হাসিনা পালানোর পর থেকে ভারত একের পর এক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনা কে বাংলাদেশে পূর্নপ্রতিষ্ঠা করার জন্য সেটা আমাদের জন্য ভয়াবহ এক উদ্বেগের কারন।
বর্তমান সরকারের উচিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটি যৌক্তিক সমাধান করা নয়তোবা দেশে মারাত্মক গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে।