স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আগে যেখানে সীমিত পরিসরে মাদকের কারবার চলত, পাঁচ আগস্টের পর তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। মাদকের সহজলভ্যতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ ও যুবকরা। সংক্রমণের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এর ভয়াবহতা, ফলে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তিতে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অশান্তি তৈরি হচ্ছে পরিবারে। মাদকাসক্ত তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।
সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদকের কারবার চলছে। যারা আগে থেকেই মাদকাসক্ত ছিল, তারা সহজে ইয়াবা, গাজাসহ নানা ধরনের মাদক হাতের নাগালে পাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অনৈতিক ব্যবসায় অল্প সময়ে বেশি লাভ হওয়ায় অনেকেই এতে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি স্কুল, কলেজ পড়ুয়া তরুণরাও এসব দেখে মাদক ব্যবসা ও সেবনের দিকে ঝুঁকছে।
কয়েকজন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, প্রকাশ্যে মাদকের কারবার চলছে। এসব দেখে আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কি শিখছে? মাঝে মধ্যে বাচ্চাদের জীবন নিয়ে সংশয়ে থাকি, কখনও যদি এসবের নাগাল পেলে গিলে ফেলে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে জীবনের ঝুঁকি থাকে।
তাদের দাবি, প্রশাসনের নজরের কাছাকাছি এলাকায় মাদকের কারবার চললেও পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করে। মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের কয়েকদিন পরই দেখি ছাড়া পেয়ে যায়! ছাড়া পেয়ে ফিরে এসে পুনরায় আবার একই ব্যবসায় জড়িয়ে যায়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ার মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবা, গাজাসহ নানা রকম মাদকের কারাবার করতে সুযোগ পাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদকাসক্ত ব্যক্তি বলেন, ৫ আগস্টের আগে গাঁজা, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক সংগ্রহ করতে হলে দুর্গম এলাকায় যেতে হতো এবং মানুষ অতি গোপনীয়তার সাথে মাদকের কারবার ও ব্যবসা পরিচালনা করতো। তবে ৫ আগস্টের পর মাদকের বিস্তার বেড়েছে এবং গাঁজা,ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। দীঘিনালার বাবুছড়া সীমান্তসহ বিভিন্ন স্থান থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক দীঘিনালায় প্রবেশ করছে।
তিনি আরও জানান, সমাজে ভদ্রতার আড়ালে পরিচিত অনেক মানুষই মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের প্রতি কেউ সন্দেহ করে না, ফলে তারা জনবহুল এলাকাতেই সহজে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বোয়ালখালি বাজার পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমাজসেবক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এবং সহজলভ্যতার কারণে এলাকার কিশোর ও তরুণরা ভয়ংকর পথে পা বাড়াচ্ছে। এতে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান তিনি।
খাগড়াছড়ি জেলা রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউথ লিডার মো. দুলাল হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মাদকের করাল গ্রাস থেকে তরুণদের বাঁচাতে খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবামূলক ও মানবিক কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মাদকের বিস্তার রোধ করা না গেলে বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার। তিনি বলেন, আমি যোগদান করার পর থেকে মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে। দীঘিনালা সেনাজোনের সহযোগিতায় সম্প্রতি কয়েকটি অভিযানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ মাদক উদ্ধার এবং জড়িতদের আটক করা হয়েছে। পুলিশ সবসময় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। সমাজের সর্বস্তরের সহযোগিতা পেলে দীঘিনালাকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. বুলু শেখ বলেন, জনবল সংকট থাকলেও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত আমরা উপজেলাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করছি। সীমান্ত দিয়ে মাদকের চোরাচালান বন্ধ এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা পেলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব হবে।
সচেতন মহল মনে করছে, কেবল অভিযান নয়, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যুবকদের কর্মমুখী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা জরুরি। অন্যথায় এই সামাজিক সংকট আরও গভীর হবে।



















