বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বকালের সেরা আদর্শ। তাঁর চরিত্র, আচরণ ও জীবনযাপন প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে মানবতার জন্য দিকনির্দেশনা। বিশেষ করে নারীদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ, সদাচার, সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের দৃষ্টান্ত মানব ইতিহাসে বিরল।
পরিবারের নারীদের সঙ্গে যেমন তিনি অত্যন্ত স্নেহময় ব্যবহার করতেন, তেমনি সমাজের অন্যান্য নারীর প্রতিও ছিলেন কোমল হৃদয়, সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, একবার একদল নারী ও শিশু বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের দেখে বলেন—“তোমরা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” এই বাক্যেই ফুটে ওঠে নারীদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা।
আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, খাদিজা (রা.)-এর বোন হালা বিনতু খুওয়াইলিদ একদিন নবীজির সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলে তিনি হকচকিয়ে যান। কারণ খাদিজা (রা.)-এর স্মৃতিই ছিল তাঁর কাছে অমূল্য সম্পদ। প্রিয়তমা স্ত্রীর বোনকে দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং আনন্দে বলেন—“আল্লাহ! এ তো হালা বিনতু খুওয়াইলিদ!”। এই ঘটনায় বোঝা যায়, নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে তিনি কতটা আন্তরিক ছিলেন।
রাসুল (সা.) ছিলেন এমন এক মহান শিক্ষক, যিনি পুরুষ-নারী উভয়ের জন্যই সমানভাবে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। আনসার নারীদের সম্পর্কে তিনি প্রশংসা করে বলতেন—“আনসার নারীরা কতই না উত্তম! দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে লজ্জা কখনো তাদের বাধা দেয়নি।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৬)।
মুসলিম নারীদের অনুরোধে নবীজি তাঁদের জন্য বিশেষ দিন নির্ধারণ করেন, যাতে তাঁরা ধর্মীয় শিক্ষা ও জীবনবিধান সরাসরি জানতে পারেন। আবু সায়িদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন—“নারীরা বললেন, আল্লাহর রাসুল, পুরুষরা সব সময় আপনার কাছে প্রাধান্য পায়। আমাদের জন্যও পৃথক একটি দিন নির্ধারণ করুন।” তখন তিনি নারীদের জন্য আলাদা দিন ঠিক করেন এবং সেদিন তাঁদের শিক্ষা ও উপদেশ দিতেন। (বুখারি, হাদিস: ১০১)।
নারীদের প্রতি রাসুলের আচরণ শুধু পরিবারের সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। খায়বার যুদ্ধে বিজয়ের পর বন্দি নারীদের মধ্যে বনু নাজির গোত্রের সরদারকন্যা সাফিয়া বিনতু হুওয়াইকে প্রথমে দিহইয়া (রা.)-এর হাতে দেওয়া হলেও নবীজি তাঁর মর্যাদা উপলব্ধি করে তাঁকে স্বাধীনতা দেন এবং পরে বিবাহ করেন। এর মাধ্যমে সাফিয়াকে শুধু স্বাধীনতাই নয়, বরং উম্মুল মুমিনিনের সম্মানিত আসন দান করেন। (বুখারি, হাদিস: ৯৪৭; মুসলিম, হাদিস: ১৩৬৫)।
হাসান (রা.) থেকে বর্ণিত—একবার এক বৃদ্ধা নবীজির কাছে এসে জান্নাতে প্রবেশের দোয়া চান। তখন তিনি মৃদু হাসি দিয়ে বললেন—“কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” এতে বৃদ্ধা দুঃখ পেয়ে কেঁদে ফেলেন। পরে নবীজি ব্যাখ্যা করে বলেন, “তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে যুবতী অবস্থায়।” এভাবেই তিনি রসিকতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে নারীদের মন জয় করতেন। (সুরা ওয়াকিয়া: ৩৬)।
রাসুল (সা.) যখন কুবায় যেতেন, তখন উম্মু হারাম বিনতু মিলহান (রা.)-এর অতিথি হতেন। একদিন তিনি নবীজির দোয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী পান যে তিনি সমুদ্রযুদ্ধে অংশ নেবেন। সত্যিই মুয়াবিয়া (রা.)-এর আমলে তিনি সমুদ্র অভিযানে অংশ নেন এবং শহিদ হন। (বুখারি, হাদিস: ৬২৮৩)।
নারীদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর সদাচার, সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের উদাহরণ শুধু ইসলামের ইতিহাস নয়, বরং পুরো মানবজাতির জন্য এক আলোকবর্তিকা। পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে শত্রুপক্ষের নারীদের প্রতিও তাঁর আচরণ ছিল মহত্ত্বের প্রতীক। তাই নারীর অধিকার ও সম্মানের ক্ষেত্রে নবীজির জীবনযাপন আজও আমাদের জন্য অনুকরণীয় পথপ্রদর্শক।