বাংলাদেশের রাজনীতির ক্যালেন্ডারে এই তারিখটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজ বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যখন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ পাঠ করাচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজারো মানুষের চোখ ছিল একটি বিশেষ মুখের দিকে। তিনি নূরুল হক নূর যিনি মাত্র কয়েক বছর আগেও রাজপথে পুলিশের লাঠি আর হেলমেট বাহিনীর হামলার শিকার হয়ে ধুলোয় পড়ে ছিলেন। আজ সেই নূরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ইতিহাস গড়লেন।
নূরুল হক নূরের উত্থান কোনো পারিবারিক উত্তরাধিকার বা রাজনৈতিক আশীর্বাদের ফসল নয়। তার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছে রাজপথের উত্তপ্ত পিচ আর টিয়ারশেলের ধোঁয়ায়। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সাধারণ ছাত্রদের অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়ায়, তখন পটুয়াখালীর এক সাধারণ কৃষক পরিবারের এই সন্তান হয়ে ওঠেন লাখো ছাত্রের কণ্ঠস্বর। সেই সময় 'সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ'-এর ব্যানারে তার সাহসী নেতৃত্ব তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে যখন দীর্ঘ ২৮ বছর পর ভোট হয়, তখন সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে তিনি ভিপি নির্বাচিত হন। সেই বিজয় ছিল সাধারণ ছাত্রদের কাছে এক পরম আশ্রয়ের নাম। ডাকসু ভবনে তার ওপর বর্বরোচিত হামলা হলেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। বারবার রক্তাক্ত হয়েও তিনি স্লোগান দিয়েছেন "অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।"
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান ঘটে, নূরুল হক নূর ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দাবিতে রাজপথে তার সক্রিয় উপস্থিতি তরুণদের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিল। আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল পদের জন্য নয়, বরং জনগণের মুক্তির জন্য রাজনীতি করেন। আজ যে নতুন বাংলাদেশ আমরা দেখছি, তার প্রতিটি ধূলিকণায় নূরের মতো হাজারো যোদ্ধার ঘাম আর রক্ত মিশে আছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পেয়েছেন। নূরকে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে আসা প্রধানমন্ত্রীর এক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন বাংলাদেশে মেধা, সাহস এবং রাজপথের ত্যাগকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হবে।
নূর তার শপথ গ্রহণের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন এক বার্তায় লিখেছেন "শুকরিয়া মহান রবের প্রতি, কৃতজ্ঞতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এর প্রতি, ধন্যবাদ গলাচিপা-দশমিনাবাসীকে"। এই একটি বাক্যই বলে দেয় তিনি তার শিকড়কে ভোলেননি।
নূরুল হক নূরের জীবন থেকে আজ অনেক কিছু শেখার আছে:
-
আপসহীন নেতৃত্ব: ক্ষমতার মোহে বা জীবননাশের হুমকিতে তিনি কখনোই নতি স্বীকার করেননি।
-
সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: সাধারণ জীবনযাপন এবং কোনো প্রকার দুর্নীতির স্পর্শ ছাড়াই তিনি আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।
-
বিচক্ষণতা: নিজের রাজনৈতিক দল 'গণঅধিকার পরিষদ' গঠন করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তরুণরা চাইলেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।
নূর আজ কেবল সারা দেশের নেতা নন, তিনি তার নিজ এলাকা পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা)-এর মানুষের নয়নমণি। এলাকার মানুষ তাকে ভালোবেসে সংসদে পাঠিয়েছে এবং আজ যখন তিনি সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তখন পুরো পটুয়াখালীতে বইছে আনন্দের জোয়ার। অবহেলিত এই জনপদের উন্নয়নে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবেন বলে বিশ্বাস সবার।
নূরুল হক নূর আজ কেবল একজন প্রতিমন্ত্রী নন, তিনি একটি আদর্শের নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সাধারণ মানুষের সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। রাজপথের সেই লড়াকু ছেলেটি আজ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ডেস্কে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, রাজপথে যেভাবে তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, সচিবালয়েও তিনি একইভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের পক্ষে অনড় থাকবেন।
শুভকামনা নূরুল হক নূর। আপনার হাত ধরে নতুন বাংলাদেশ পৌঁছে যাক তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে।
আবদুল্লাহ আল মামুন, আই নিউজ বিডি



















