close

ভিডিও আপলোড করুন পয়েন্ট জিতুন!

এত কৌশলেও জয় পেল না আওয়ামী লীগ!

Atiqur Rahman avatar   
Atiqur Rahman
ফিরে দেখা নির্বাচন ২০০১: নানা কৌশলেও ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি আওয়ামী লীগ!

আগে থেকেই ঠিক ছিল অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। তারপরও নানা কৌশল করেছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি!

বাংলাদেশের বয়স তখন ৩০ বছর। ওই ৩০ বছরে এর আগে আর কোনো সংসদই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। সপ্তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৩ জুলাই। শেষ হয় ২০০১ সালের ১৩ জুলাই,

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে সপ্তম জাতীয় সংসদের অবসানের মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো একটি সংসদ পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে। তবে এই সময়কাল ছিল সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিরোধী দলের সংসদ বর্জনে ভরপুর।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দেশজুড়ে একের পর এক বোমা হামলা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটে। একই সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১৩ জুলাই ২০০১ সংসদের মেয়াদ শেষ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল আনা হয়। ১৯ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং ১ অক্টোবর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে অংশ নেয়, আর বিএনপির নেতৃত্বে চার দলীয় জোট আসন সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপিসহ চার দলীয় জোট বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়। বিপরীতে আওয়ামী লীগের বহু প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী পরাজিত হন।

নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগ পুনর্নির্বাচনের দাবি জানালেও শেষ পর্যন্ত ১০ অক্টোবর ২০০১ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পাঁচ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

বাংলাদেশে প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এই সংসদ টিকেছিল আড়াই বছর। জিয়াউর রহমানের সময়ে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। এই সংসদের আয়ু ছিল ২ বছর ১১ মাস। তৃতীয় সংসদ নির্বাচন এরশাদে সময়ে, ১৯৮৬ সালে। এই সংসদের মেয়াদ ছিল প্রায় দেড় বছর। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় ২ বছর ৭ মাস পরে, ১৯৯০ সালে। আর ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ১২ দিনের মাথায়।পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্তি উপলক্ষে উৎসব করার পরিকল্পনা ছিল সরকারি দল আওয়ামী লীগের। তবে ১০ জুলাই স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী মারা গেলে আনন্দ উৎসব বাতিল করা হয়। তখন কাজ করতাম দৈনিক ইত্তেফাক–এ। সংসদ অধিবেশন নিয়ে প্রতিদিনকার প্রতিবেদন লেখার দায়িত্ব ছিল। অধিবেশনের শেষ দিনের সাক্ষী ছিলাম আমিও। শেষ দিনে ‘সুদীর্ঘ পাঁচ বছরের সুযোগ্য নেতৃত্বের ফলে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হওয়ায়’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাবও পাস হয়েছিল। রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংসদের অবসান ঘটেছিল ঠিক রাত ১২টা ১ মিনিটে। আর ঠিক ওই সময়েই বিএনপি ‘আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান’ উপলক্ষে দেশব্যাপী মহোৎসব ও বিজয় মিছিল বের করে।পাঁচ বছর পূর্ণ মেয়াদ কাটালেও সময়টা মোটেই মসৃণ ছিল না। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো শেষ দেড় বছর সংসদে অনুপস্থিত ছিল। ফলে শুরুতে সংসদ কিছুটা প্রাণবন্ত থাকলেও পরে আর সেটি থাকেনি, বরং বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা সে সময় ঘটেছিল।

যেমন ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনে সিপিবির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ৪ জন। একই বছরের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিলেন আরও ৯ জন। ৩ জুন গোপালগঞ্জের বানিয়াচর গ্রামে এক রোমান ক্যাথলিক গির্জায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। এরপরে ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ২১ জন।

পাঁচ বছর পূর্ণ মেয়াদ কাটালেও সময়টা মোটেই মসৃণ ছিল না। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো শেষ দেড় বছর সংসদে অনুপস্থিত ছিল। ফলে শুরুতে সংসদ কিছুটা প্রাণবন্ত থাকলেও পরে আর সেটি থাকেনি, বরং বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা সে সময় ঘটেছিল।

যেমন ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনে সিপিবির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ৪ জন। একই বছরের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিলেন আরও ৯ জন। ৩ জুন গোপালগঞ্জের বানিয়াচর গ্রামে এক রোমান ক্যাথলিক গির্জায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ১০ জন। এরপরে ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ২১ জন।

আওয়ামী লিগের আমলেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়। ২০০১ সালের ২৭ জুন প্যারিস থেকে এ ঘোষণা আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে এ নিয়ে ২৮ জুন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাবও নেয়। (বাংলাদেশের তারিখ, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান)। এর পরের টানা চার বছরই বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ।১৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপিসহ চার দল সরকারের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে সকাল–সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল। এর পাল্টা হিসেবে ‘শান্তি মিছিল’-এর আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। দুই দলের মিছিল মুখোমুখি হয় মালিবাগে। সেখানে গোলাগুলি হলে পুলিশের একজন কনস্টেবলসহ মারা যায় চারজন। গুলির জন্য পরস্পরকে দায়ী করা হলেও পরদিন ঢাকার প্রধান দৈনিকগুলো যেসব ছবি প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ডা. এইচ বি এম ইকবালের মিছিল থেকেই গুলি ছোড়া হয়েছে। গুলি ছোড়ার একাধিক ছবি প্রকাশ করে প্রথম আলো। পরদিন প্রথম আলো পিস্তল হাতে গুলি করছেন, এমন চারজনের ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে। সেই সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘ইকবালের মিছিলে সন্ত্রাসী মুখ’। এ নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লেও ডা. ইকবালের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।ফেনীর গডফাদার জয়নাল হাজারী ছিলেন আরেক সন্ত্রাসী মুখ। আওয়ামী লীগের এই সংসদ সদস্য ফেনীকে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী। জয়নাল হাজারীর কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ লেখার কারণে ২৫ জানুয়ারি হাজারী বাহিনীর (যাদের ক্লাস কমিটি বলা হতো) কয়েকজন সদস্য তৎকালীন ইউএনবির জেলা প্রতিনিধি টিপু সুলতানকে নির্মমভাবে মেরে মৃত ভেবে ফেলে রেখেছিল। পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার একটি সহায়ক তহবিল গঠন করে টিপু সুলতানকে ব্যাংককে পাঠায়। এই নিয়ে জয়নাল হাজারী ২৬ জুন জাতীয় সংসদে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে কুৎসিত ভাষায় বিষোদ্‌গার করেছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা সে সময় সংসদে উপস্থিত থাকলেও কেউই হাজারীকে থামাননি। সেই টিপু সুলতান এখন প্রথম আলোতে কর্মরত এবং দেশের একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক।

এ ছাড়া সে সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন প্রতিমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলে দীপু চৌধুরী ও তৎকালীন চিফ হুইপ হাসানাত আবদুল্লার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ। পরবর্তী সময়ে তিনি বরিশালের মেয়র হয়েছিলেন।

এরপর ২ জুলাই মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয় যে নিরাপত্তার জন্য শেখ হাসিনা গণভবনেই থাকবেন আর ৩ জুলাই শেখ রেহানাকে ধানমন্ডির একটি বাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ৬ জুলাই শেখ হাসিনা বলেন যে তিনি যত দিন রাজনীতি করবেন, তত দিন গণভবনেই থাকবেন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে দেন ১৬ আগস্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে।

প্রসঙ্গত, এই গণভবনেই শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে এসেছিলেন ২০০৯ সালে। আর সেই গণভবন থেকেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।

অবশেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন

সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান(১ মার্চ ১৯৩৬—৬ জুন ২০১৭) সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন ১৫ জুলাই। শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করে বিএনপি। দায়িত্ব নিয়েই প্রধান উপদেষ্টা ১৩ জন সচিবকে বদলি করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই দিনই রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন চার সচিব। তাঁরা ছিলেন মুখ্য সচিব ড. এস এ সামাদ, যোগাযোগসচিব সৈয়দ রেজাউল হায়াত, ইআরডি সচিব ড. মসিউর রহমান ও প্রেস সচিব জাওয়াদুল করিম। এরপর আরও বদলি করা হয়। যেমন ২৮ জুলাই ২১ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) দেওয়া হয়, ৪ জনকে করা হয় ওএসডি, ১ আগস্ট আরও ১১ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ এবং ৮৪ ওসি রদবদল করা হয়। পরের দিন ২৭ এএসপি ও ১০৮ ইউএনওকে বদলি করা হয়।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১৯ আগস্ট। ১ অক্টোবর নতুন নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সে সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন এম এ সাঈদ। পরের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাস ও সহনশীলতার অভাব আশঙ্কাজনক।’

সাংবাদিক হিসেবে অভিজ্ঞতার কথা বললেন একজন জৈষ্ঠ্য সাংবাদিক- দুই দলের দুই নেত্রী তখন সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। উদ্দেশ্য নির্বাচনে প্রচার চালানো। সেই প্রচারের তথ্য সংগ্রহ করতে একদল সাংবাদিকসহ আমি চট্টগ্রাম যাই ১১ সেপ্টেম্বর। বিশেষ নিরাপত্তা পাচ্ছিলেন শেখ হাসিনা। ফলে আগের মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে নির্বাচনী প্রচার চালাননি তিনি। নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হয়েছিল সাধারণ ভোটারদের। এতে অসন্তুষ্ট ছিলেন তাঁরা। তবে এত বছর পর বিশেষভাবে মনে আছে ফেনীর স্মৃতি। সেখানে যাই ১২ সেপ্টেম্বর। জয়নাল হাজারী তখন পলাতক। কয়েক দিন ধরেই ফেনীতে ঘটছিল নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। থমথমে এক পরিবেশ। তার ওপর তুমুল বৃষ্টি। যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কা। এ আশঙ্কা ছিল সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও। গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে গুলি হয়েছে। এ গুজবের কারণে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কর্মীরা রাস্তায় বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করেন। সেই ফেনী থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কারও মনেই স্বস্তি ছিল না।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করে। আগে সংসদ সদস্য ছিলেন, এমন ২৩ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। বিএনপির নেতৃত্বে চার দল আসন ভাগাভাগি করে। যেমন বিএনপি নির্বাচন করে ২৫১টি আসনে, জামায়াতে ইসলামী ৩০ আসনে, জাতীয় পার্টি (নাজিউর) ১১ আসনে ও ইসলামী ঐক্য জোট প্রার্থী দেয় ৭টি আসনে। অন্যদিকে এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য ফ্রন্ট দেয় ২৮৮ জন প্রার্থী। এই ফ্রন্টের আরেকটি দল ছিল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন।

নির্বাচন হয়েছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে। আর সেই নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি। ২ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলোর মূল শিরোনাম ছিল, ‘বিএনপিসহ চার দলের বিপুল বিজয়’। এর নিচে লেখা ছিল, ‘উৎসবের আমেজে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ, কিছু স্থানে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা, মহিলাসহ ভোটার উপস্থিতি ব্যাপক’। সেদিন পত্রিকায় আরেকটি শিরোনাম ছিল, ‘সারা দেশে ১৩৭ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত, বরিশাল, ভোলা ও শরীয়তপুরে নিহত ৫’।

নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দল- দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ২৮ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ৫২ সাবেক এমপি, ২৪ জন অবসরপ্রাপ্ত আমলা পরাজিত হয়েছিলেন। এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১৪টি, জামায়াতের ১৭টি।

নির্বাচনের পরে ফলাফল মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোনো প্রথাই আবার দেখা যায়। ৩ অক্টোবর শেখ হাসিনা নির্বাচন ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘সূক্ষ্ম নয়, স্থূল কারচুপি করে ফলাফল বদলে দেওয়া হয়েছে।’ পরদিন আবার বলেন, ‘শপথ নেব না, সংসদেও যাব না, পুনর্নির্বাচন চাই।’ এরই মধ্যে আবার খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানিয়ে এরশাদ গোপনে লন্ডন পাড়ি দেন। ১০ অক্টোবর নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া।

সূত্র: প্রথম আলোর বিভিন্ন সংখ্যা, সংগ্রাম–এর নোটবুক, বাংলাদেশের তারিখ, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং নির্বাচন কমিশন

Geen reacties gevonden


News Card Generator