close

ভিডিও দেখুন, পয়েন্ট জিতুন!

একজন আপোষহীন মহানায়িকার বিদায় 

Sampadakiya Anuchchhed avatar   
Sampadakiya Anuchchhed
বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের অটল প্রহরী, জাতির মা

 মহানায়িকার বিদায় 

বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের অটল প্রহরী, জাতির মা

 

রাজনীতির জগতে পাপ-পুণ্য, ভুল-শুদ্ধ, অপরাধ-প্রায়শ্চিত্ত সবই মিশে থাকে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা এই অন্ধকারের মধ্যেও আলোর দিশা দেখান, যাঁদের জীবন হয়ে ওঠে একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তেমনই এক অসাধারণ নারী। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, যখন তিনি চিরবিদায় নিলেন, বাংলাদেশের আকাশ যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। লাখো মানুষের চোখে জল, হৃদয়ে অব্যক্ত শ্রদ্ধা। আজ আর কোনো দলীয় বিভেদ নেই, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা গভীর শূন্যতা আর স্মৃতির ঢেউ। তিনি ছিলেন আমাদের প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ সন্তান একজন মা, একজন যোদ্ধা, একজন দূরদর্শী নেত্রী। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের মহাকাব্য, ত্যাগের অমর গাথা। আজ তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে চোখ ভিজে আসে, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। কারণ তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক, নারী শক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

খালেদা জিয়ার জীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসাধারণত্বের বীজ। ১৯৪৫ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, মা তৈয়বা খাতুন। শৈশব কাটে ফেনী নদীর তীরে, প্রকৃতির কোলে। সেই সময়ের বাংলাদেশ তখনো পাকিস্তানের অংশ। ছোট্ট খালেদা স্কুলে যেতেন, বই পড়তেন, বন্ধুদের সাথে খেলতেন। তাঁর মধ্যে ছিল একটা স্বাভাবিক সাহস, একটা গভীর সংবেদনশীলতা। পরিবারের স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠা সেই কিশোরী কখনো ভাবেননি যে একদিন তাঁকে জাতির ভাগ্য গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, নম্র, কিন্তু দৃঢ়চেতা। সেই শৈশবের সরলতা পরবর্তী জীবনে তাঁর শক্তির উৎস হয়ে উঠবে।

১৯৬০ সালে তাঁর জীবনে আসেন জিয়াউর রহমান তৎকালীন পাকিস্তান আর্মির এক তরুণ কর্মকর্তা। তাঁদের বিয়ে হয় ভালোবাসা আর সম্মানের ভিত্তিতে। সেই সংসার ছিল সুখের, শান্তির। দুই পুত্র তারেক রহমান এবং প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো তাঁদের জীবনকে পূর্ণতা দেন। খালেদা জিয়া তখন একজন আদর্শ গৃহিণী। স্বামীর কর্মজীবনের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন, কিন্তু সবসময় পর্দার অন্তরালে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের জীবন বদলে দেয়। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে, হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক। খালেদা জিয়া তখন স্বামীর অনুপস্থিতিতে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। যুদ্ধের সেই কঠিন দিনগুলোতে তিনি নীরবে সহ্য করেন উদ্বেগ, ভয়। কিন্তু তাঁর মধ্যে জাগে এক গভীর দেশপ্রেম। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান দেশ গড়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন। খালেদা জিয়া তাঁর পাশে থাকেন সহায়ক হিসেবে।

কিন্তু সুখের দিনগুলো বেশিদিন থাকে না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। সেই খবর যখন আসে, খালেদা জিয়ার জীবন যেন থেমে যায়। একজন স্ত্রী হারান স্বামীকে, দুই সন্তান হারায় বাবাকে। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। স্বামীর অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে তিনি এগিয়ে আসেন। ১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সন হন। তখন থেকে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা এক নারীর অদম্য সংগ্রাম। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি রাজপথে নামেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন তাঁকে করে তোলে জাতীয় নেত্রী। লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, ঘরে নজরবন্দি সব সহ্য করেন অবিচল মনে।

১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই জয় ছিল ঐতিহাসিক। তাঁর শাসনকালে দেশ দেখে অভূতপূর্ব উন্নয়ন। যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। শিক্ষা খাতে বিপ্লব: প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক, মেয়েদের জন্য ফ্রি শিক্ষা। স্বাস্থ্য খাতে হাসপাতাল নির্মাণ, নারী ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ। অর্থনীতি দ্রুত বাড়তে থাকে, দারিদ্র্য কমে। ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় এসে তিনি দেশকে আরও এগিয়ে নেন। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখান, অবকাঠামোর জাল বিস্তার করেন। তাঁর দূরদর্শিতা ছিল অসাধারণ জাতীয়তাবাদ, ইসলামী মূল্যবোধ আর আধুনিক উন্নয়নের সমন্বয়। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত।

কিন্তু রাজনীতির চক্রে তিনি বিরোধী দলে চলে যান। তবু হাল ছাড়েননি। ২০০৬-২০০৮ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন সময় আসে ২০০৯ থেকে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৬ বছরের শাসনকালকে অনেকে ফ্যাসিবাদী শাসন বলে অভিহিত করেন। সেই সময় খালেদা জিয়ার জীবন হয়ে ওঠে অসহনীয় যন্ত্রণার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম রূপ দেখেন তিনি। মিথ্যা মামলার পাহাড় দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, এমনকি হত্যা মামলা। ২০১৮ সালে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়। বয়স তখন ৭০ ছাড়িয়েছে, শরীরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, লিভারের জটিলতা। কারাগারের নির্জন সেলে তিনি কাটান দিনের পর দিন। চিকিৎসার অভাব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। একজন মা, যিনি জাতির জন্য এত কষ্ট করেছেন, তাঁকে এভাবে নির্যাতন করা হয়। ২০২০ সালে করোনার মধ্যে সাময়িক মুক্তি পান, কিন্তু ঘরে বন্দি। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার অনুমতি বারবার অস্বীকার করা হয়। সেই ১৬ বছর ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। কিন্তু তিনি কখনো ভাঙেননি। তাঁর চোখে ছিল অপরাজেয় আলো, মুখে ছিল দৃঢ় হাসি। তিনি বলতেন, “আমি জাতির জন্য কষ্ট সহ্য করছি।” সেই কষ্ট দেখে লাখো মানুষের হৃদয় ভেঙেছে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাঁর মামলাগুলো খারিজ হয়। তিনি কিছুটা মুক্ত বাতাস পান। ২০২৫ সালে লন্ডনে উন্নত চিকিৎসা করেন, ফিরে আসেন দেশে। কিন্তু অসুস্থতা তাঁকে ছেড়ে যায়নি। শেষদিন পর্যন্ত তিনি দেশের জন্য চিন্তা করেছেন, ছোট নাতি-নাতনিদের সাথে সময় কাটিয়েছেন। ৮০ বছর বয়সে এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয় স্বামী জিয়াউর রহমানের পাশে যেন তাঁদের অসমাপ্ত স্বপ্ন চিরনিদ্রায় মিলিত হয়।

খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের নেতৃত্ব মানে ত্যাগ, ধৈর্য আর অবিচল বিশ্বাস। তিনি প্রমাণ করেছেন একজন নারী কতটা শক্তিশালী হতে পারেন। তাঁর উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের মা, স্বাধীনতার সন্তান। আজ তাঁর বিদায়ে আমরা কাঁদি, কিন্তু তাঁর আদর্শ আমাদের পথ দেখাবে। বিদায়, দেশমাতৃকা। আপনার স্বপ্ন আমরা পূরণ করব। আপনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator