চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুরহাট, মৈশাদী, শিলন্দিয়া, চরভৈরবী ও ফরিদগঞ্জসহ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা অঘোষিতভাবে চিকিৎসক সেজে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা ডিগ্রি ছাড়াই এসব ওষুধ বিক্রেতারা রোগীদের শারীরিক উপসর্গ শুনে সরাসরি প্রেসক্রিপশন লিখছেন এবং উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধ সরবরাহ করছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক ফার্মেসিতে রোগী দেখার জন্য আলাদা টেবিল ও চেয়ার স্থাপন করে রীতিমতো চেম্বার খুলে বসেছেন ব্যবসায়ীরা, যেখানে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে প্রেসক্রিপশন প্রদান ও ওষুধ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এই অসাধু চক্রটি মূলত গ্রামের সহজ-সরল মানুষের অজ্ঞতা ও দ্রুত সুস্থ হওয়ার প্রবণতাকে পুঁজি করে তাদের এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা চিকিৎসা পেশার নীতিমালার চরম লঙ্ঘন এবং প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।
মার্কেটপ্লেস পণ্যসমূহ (Marketplace)
ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামান্য জ্বর, কাশি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কথা বললেই এসব ভুয়া চিকিৎসকরা রোগীদের শরীরের অবস্থা যাচাই না করেই অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন শক্তিশালী ওষুধ ধরিয়ে দিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে ফার্মেসিতে গিয়ে তাৎক্ষণিক ওষুধ নেওয়াকে তারা অধিক সুবিধাজনক মনে করেন, কিন্তু পরবর্তীতে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তারা আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের শরীরে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন যে, এমবিবিএস চিকিৎসকদের কাছে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ ও সময় বাঁচানোর তাগিদে তারা এই ফার্মেসিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, কিন্তু এই খামখেয়ালি চিকিৎসা তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও ওষুধ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং নিয়মিত তদারকির অনুপস্থিতিতেই এসব ফার্মেসিগুলো ছোটখাটো ক্লিনিকের রূপ নিয়ে আইনবহির্ভূত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে দায়সারা অভিযান পরিচালনার কথা শোনা যায়, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের মতে, অবৈধভাবে চিকিৎসা প্রদানকারীদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে যোগ্য চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে ওষুধ প্রশাসনকে আরও বেশি সক্রিয় ও জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন।
চাঁদপুরের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার এই বেহাল দশা অদূর ভবিষ্যতে পুরো জেলাকে একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। যদি এখনই এই ‘ফার্মেসি ডাক্তার’ সিন্ডিকেটকে প্রতিহত করা না যায়, তবে সাধারণ মানুষ অপচিকিৎসার শিকার হয়ে তাদের মূল্যবান জীবন হারাবে। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির চেয়েও এখন জরুরি হয়ে পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং এই অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে কোনো অযোগ্য ব্যক্তি চিকিৎসক পরিচয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়। যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপই পারে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তি দিতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।