বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সন্ধ্যা নদীসহ এর শাখা খাল ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলো একসময় দেশীয় প্রজাতির মাছের অফুরন্ত উৎস ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এখন বিপন্ন হতে চলেছে প্রায় অর্ধশতাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় যেমন— তালাপ্রসাদ খাল, আবাসন খাল, বাইশারী খাল, বাংবাজার খাল এবং নান্দুহার খাল একসময় দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব খালের নাব্যতা হ্রাস, কচুরিপানার আধিক্য এবং অবৈধ দখলের কারণে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নান্দিনা, সরপুঁটি, পাবদা, টেংরা, আইড়, বোয়াল ও চিতল মাছের মতো সুস্বাদু দেশীয় মাছ এখন বাজার থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে।
একসময় এ অঞ্চলের বাজারগুলোতে কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, আইড়, বোয়াল, চিতল, গজার, এবং বৈরালী মাছের প্রচুর সরবরাহ ছিল। বর্তমানে এসব মাছের দেখা মেলা ভার। বিশেষ করে নান্দিনা, সরপুঁটি, মহাশোল ও রিটা মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির তালিকায়। স্থানীয় জেলেরা জানান, আগে জাল ফেললেই মিলত রূপালি ইলিশ আর বড় বড় বোয়াল, কিন্তু এখন দিনভর চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।
মাছ ধ্বংসের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশীয় মাছ ধ্বংসের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ দায়ী, সন্ধ্যা নদী ও শাখা খালগুলোতে অবাধে কারেন্ট জাল এবং ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত ‘বেহুন্দি জাল’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে মাছের রেনু ও পোনা নিধন হচ্ছে নির্বিচারে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে জলাশয়ে মিশছে, যা মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করছে। এ ছাড়াও অপরিকল্পিতভাবে খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং কচুরিপানার আধিক্যের কারণে মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অপর দিকে মা মাছ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ না হওয়া অন্যতম বড় কারণ।
বানারীপাড়ার প্রবীণ এক জেলে আক্ষেপ করে বলেন, "আগে সন্ধ্যা নদীতে জাল ফালাইলে পেট ভইরা মাছ খাইতাম, বাজারেও বেচতাম। এহন সারাদিন নদীতে পইড়া থাইক্যাও তেলের খরচ ওঠে না। সব বিদেশি চাষের মাছের দখলে চইলা গ্যাছে বাজার।"
বানারীপাড়া উপজেলার বর্তমান মৎস্য কর্মকর্তা এ এফ এম নাজমুস সালেহীন এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে এবং মা মাছ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। খেজুর বাড়ি তালাপ্রসাদ, নান্দুহার, জম্বুদ্বীপ ও বাইশারী খালের মতো প্রাকৃতিক উৎসগুলো যদি আমরা দূষণমুক্ত এবং দখলমুক্ত রাখতে পারি, তবেই দেশীয় মাছের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।"
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন এবং নিষিদ্ধ জাল জব্দ করছেন। তবে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ছাড়া এই সম্পদ রক্ষা করা কঠিন।
পরিবেশবাদীদের মতে, দ্রুত বানারীপাড়ার অভয়াশ্রমগুলো সংস্কার না করলে এবং দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও প্রাকৃতিক বিচরণ ক্ষেত্র সংরক্ষণ না করলে আগামী প্রজন্ম বইয়ের পাতায় ছাড়া এসব মাছের দেখা পাবে না।
close
কমেন্ট করুন পয়েন্ট জিতুন!
Комментариев нет



















