চাঁদপুর শহর ও এর আশপাশের জনবহুল এলাকার হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত এবং পচা-বাসি খাবার সংরক্ষণের ঘটনা মহামারী আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক অভিযানে শহরের নামিদামি ও সাধারণ মানের রেস্তোরাঁগুলোতে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। মূলত মুনাফালোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্রাহকদের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে নোংরা রান্নাঘরে খাবার তৈরি, একই ফ্রিজে কাঁচা মাংসের সাথে রান্না করা খাবার সংরক্ষণ এবং পোড়া তেল বারবার ব্যবহারের মতো গর্হিত অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ২৭ অক্টোবর মেঘনা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট এবং ১৪ জুলাই ইউরেশিয়া ও আরোম্যাক্স রেস্টুরেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত অভিযানে পচা-বাসি খাবার জব্দ ও জরিমানা করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খাদ্য নিরাপত্তা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল আইন অমান্য করাই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যকে একটি দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, বাইরের চাকচিক্যময় ডেকোরেশন দেখে মানসম্মত খাবারের আশায় হোটেলে ঢুকলেও রান্নাঘরের অভ্যন্তরীণ চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ভুক্তভোগীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই খাবার তৈরির পানি, বাসনপত্রের পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মচারীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার কোনো বালাই নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জানান, হোটেলগুলোতে খাবার খাওয়ার পর প্রায়ই পেটের পীড়াসহ নানা শারীরিক জটিলতায় পড়তে হচ্ছে, যার মূল কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংরক্ষিত পচা খাবার। বিশেষ করে লঞ্চঘাট ও চেয়ারম্যান ঘাটের মতো ব্যস্ততম এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে তদারকির অভাবে এই অনিয়ম আরও প্রকট। অভিযোগ রয়েছে যে, ব্যবসায়ীরা শুধুমাত্র মুনাফার দিকে নজর দিয়ে ফ্রিজে মাসের পর মাস বাসি খাবার জমিয়ে রাখছেন এবং তা পুনরায় গরম করে ক্রেতাদের সামনে পরিবেশন করছেন, যা খাদ্য নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সচেতন মহল দাবি করছেন যে, কেবল নামমাত্র জরিমানা আদায় করে দায় সারলে অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা জরিমানার টাকা পরিশোধ করেই পুনরায় একই অনিয়ম চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন। হোটেল মালিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে খরচ কমাতে গিয়ে তারা অনেক সময় হিমশিম খাচ্ছেন, তবে এই অজুহাত কোনোভাবেই অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের বৈধতা দেয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, জরিমানা করার পাশাপাশি প্রতিটি রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের লাইসেন্স নবায়ন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য সনদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করতে হবে। একই সঙ্গে, যেসব প্রতিষ্ঠানে বারবার একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা বা কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট সমাধানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং প্রতিটি হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে মান নিশ্চিত করা জরুরি। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও ভোজনবিলাসের স্থানগুলো যদি নিরাপদ না হয়, তবে তা চাঁদপুরের সামগ্রিক পর্যটন ও সামাজিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীলতা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল জনমনে স্বস্তি ফিরবে। অন্যথায়, অনিয়মের এই চক্র অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যা ভবিষ্যতে একটি বড় সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।