দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ডেঙ্গু এখন এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা গত ২৪ ঘণ্টার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন দুই হাজার ২৪৯ জন রোগী। বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে অক্টোবরের চলতি দিনগুলোতে মৃত্যু ও সংক্রমণের যে হার পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ৩৮৪ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অক্টোবরেই মারা গেছেন ১৩৯ জন। সংক্রমণের এই ধারাবাহিকতা এবং মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা চিকিৎসা খাতের ওপর যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত করুণ, যেখানে প্রতিটি শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কেবল আক্রান্তের সংখ্যা নয়, বরং রোগীর শারীরিক জটিলতা ও দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের কারণে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো শয্যা পাওয়া যাচ্ছে না এবং ডেঙ্গু পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে বিলম্বসহ নানা ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৮৯৮ জনসহ চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ২৩ হাজার ৯৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি হলেও বর্তমানে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালসহ প্রতিটি বিভাগেই ডেঙ্গুর বিস্তার সমানতালে ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জনমহলে, কারণ মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপের চেয়ে দায়সারা কার্যক্রমের অভিযোগই বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৭ হাজার ৪০০ জন বলে জানালেও, নতুন করে আক্রান্তের হার যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, তার অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর পক্ষ থেকে মশা নিধনে নিয়মিত স্প্রে ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কতটা দৃশ্যমান, তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কেবল মৌসুমি কার্যক্রম নয়, বরং বছরব্যাপী পরিকল্পিত নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডেঙ্গুর এই ক্রমবর্ধমান প্রকোপ আগামী দিনগুলোতে দেশের চিকিৎসা খাতের সক্ষমতাকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে। আক্রান্তের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট তীব্র হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনে ডেঙ্গু আতঙ্ক এখন এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। অবিলম্বে মশা নিধনে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে এই মরণঘাতী পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।