প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে সংস্কার করা রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের স্থায়িত্ব মাত্র সাত দিনও টিকল না। সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার সপ্তাহ না পেরোতেই পিচ উঠে এবং নতুন সিমেন্টের ব্লক ভেঙে সড়কজুড়ে পুনরায় বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে একই অংশে আবারও নতুন করে সংস্কারকাজ শুরু করতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
এই ঘটনায় একদিকে যেমন কাজের মান ও তদারকি নিয়ে চালক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে হরিলুটের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে উঠেছে জোরালো অভিযোগ।
মাত্র ৭ দিনেই বেহাল দশা
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটারে এই চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা গেছে।
জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরকে নির্ধারিত করার ঠিক আগের চার দিন ধরে মহাসড়কের শতাধিক ভাঙাচোরা অংশ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মেরামত করা হয়। পুরোনো ইটের পাটাতন তুলে সেখানে নতুন সিমেন্টের ব্লক বসিয়ে তার ওপর পিচের প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল। তবে শুরুতেই স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকরা এই নামমাত্র সংস্কারকাজের স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হলো।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কার করা ওই অংশের বেশ কিছু স্থানে নতুন বসানো ব্লক ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। কোথাও বা পিচের প্রলেপ উঠে গিয়ে আগের মতোই বিপজ্জনক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আর এসব স্থানেই পুনরায় তড়িঘড়ি করে মেরামতের কাজ চালানো হচ্ছে। যার ফলে একই সড়কের একই অংশে অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার সংস্কারের প্রহসন চলছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও চালকদের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সড়ক সংস্কার যেন এক অন্তহীন প্রহসন। জনগণের টাকা পকেটস্থ করতে ইচ্ছাকৃতভাবে দায়সারা ও নিম্নমানের কাজ করা হয়, যাতে সারা বছর মেরামতের কাজ দেখিয়ে ঠিকাদার ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা ফায়দা লুটতে পারেন।
হাজীপাড়া মোড়ের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী রাকিব ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সাত দিন আগেই তো এই অংশে ইটের পাটাতন তুলে সিমেন্ট ও পিচ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে সেগুলো সব ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে। এখন আবার লোকদেখানো ঠিক করার নাটক চলছে। স্থায়ীভাবে টেকসই সংস্কার কেন করা হয় না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।"
নিয়মিত চলাচলকারী বাসচালক আব্দুর রশিদ বলেন, "দুই নম্বরি কাজ করলে তো বারবার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত মহাসড়কটির অবস্থা মারাত্মক খারাপ। এই ভাঙাচোরার কারণে হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারের উচিত এখানে টেকসই ও মজবুত কাজের ব্যবস্থা করা।"
আগেও উঠেছিল দুর্নীতির অভিযোগ
এই মহাসড়কে সংস্কারকাজের মান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের ১৭ কিলোমিটার সংস্কারের কাজ ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বিনিময়ে পায় রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ডন এন্টারপ্রাইজ’।
ওই সময় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে টহলরত সেনাবাহিনীর একটি দল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে প্রতি বর্গমিটারে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ৫ কেজি পাথর কম ব্যবহারের বিষয়টি হাতেনাতে ধরে ফেলে। সে সময় প্রায় ৩৬৫ টন পাথর কম ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এমনকি কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই কার্পেটিং উঠে গর্ত তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেসব গর্তে ইট ফেলে ভরাট করায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
সওজ প্রকৌশলীর অদ্ভুত সাফাই
বারবার সড়ক নষ্ট হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রংপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কামাল পাশা এক অদ্ভুত ও দায়সারা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন,
"কাজ করতেছি, উঠে যাচ্ছে; বারবার সংস্কার করছি, তাও উঠে যাচ্ছে। ইট ভেঙে যাচ্ছে, ইট তুলে ব্লক দিচ্ছি সেটিও ভেঙে যাচ্ছে। আসলে এত লোডেড (ভারী) গাড়ি চলার কারণে এমন হচ্ছে। এই সড়কের নিচের ফাউন্ডেশনই খারাপ, তাই কোনো কিছুতেই টিকছে না। এটা নতুন করে নির্মাণ ছাড়া আর কোনো বুদ্ধি নাই। নিচের ফাউন্ডেশন খারাপ হলে উপরে যতই তেল দিই না কেন, কোনো কাজ হবে না।"