দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের আওতাধীন সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজের গ্রন্থাগারে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনভিত্তিক তিনটি বই সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পক্ষ থেকে জারি করা এই নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানদের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে থাকা নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর ইতিমধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সকল শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য লিখিত তাগিদ পাঠিয়েছে। মূলত জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতের সুপারিশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে বই তিনটির মোট মূল্য ৪ হাজার ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাহফুজ উল্লাহর লেখা 'প্রেসিডেন্ট জিয়া: রাজনৈতিক জীবনী' ও 'বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম' এবং তারেক রহমানের লেখা 'সবার আগে বাংলাদেশ'—এই তিনটি বই এখন থেকে মেডিকেল লাইব্রেরিগুলোর সংগ্রহে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্দেশনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জীবনীভিত্তিক বই বাধ্যতামূলকভাবে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক ও পেশাজীবী মহলের একাংশ। আবেদনকারী প্রকাশনা সংস্থার দাবি অনুযায়ী, চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী, নার্স এবং সেবা নিতে আসা সচেতন নাগরিকদের জন্য এই বইগুলো পাঠ করা সময়োপযোগী ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে হাসপাতালের লাইব্রেরিগুলোতে পাঠ্যবই বা চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালের পরিবর্তে রাজনৈতিক জীবনী রাখার এই উদ্যোগকে অনেকে পেশাদারিত্বের পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন। হাসপাতালে আসা রোগীদের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেয়ে লাইব্রেরির বই নির্বাচন নিয়ে মন্ত্রণালয়ের এমন তৎপরতা প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নে জনমনে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৩ আগস্ট প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধি জহির দীপ্তি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদনটি জমা দেওয়ার পরপরই প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত তাতে 'জোর সুপারিশ করা হলো' বলে মন্তব্য করে অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে সেই অনুমোদনের ভিত্তিতেই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ দপ্তরপ্রধানদের কাছে নির্দেশনা পাঠায়। সরকারি খরচে এমন রাজনৈতিক বই সংগ্রহের বিষয়টি নতুন না হলেও, এর আগেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের নির্দেশনা জারি করে বিতর্ক সৃষ্টির পর তা বাতিল করার নজির রয়েছে। গত ৩ জুন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একই বইগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখার নির্দেশ দিলেও ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে মাত্র তিন মাসের মাথায় ৬ জুলাই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়েছিল। ফলে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ফলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি হাসপাতালের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনীভিত্তিক বইয়ের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে নিরপেক্ষতা ও একাডেমিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বই কেনার এমন বাধ্যবাধকতা প্রাতিষ্ঠানিক রুটিন ও পাঠ্যসূচির বাইরে অতিরিক্ত চাপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন ও প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে লাইব্রেরি সমৃদ্ধ হওয়ার কথা থাকলেও, মন্ত্রণালয়ের এমন নির্দেশনা প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগের একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। এই বিতর্কিত উদ্যোগটি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতের লাইব্রেরিগুলোতে তথ্যের নিরপেক্ষতা এবং একাডেমিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।