ঢাকার ধামরাইয়ের বাগনগর মডেল টাউন এলাকায় শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ছাদ থেকে নিচে পড়ে পাঁচ শিশু গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, সাইদুর রহমান নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ওই ভবনটিতে কোনো ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী বা সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। ঘটনার সময় সাত শিশু ভবনটির ছাদে খেলাধুলা করছিল, যার মধ্যে অসাবধানতাবশত পাঁচজন নিচে পড়ে গেলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে আল আমিন হোসেন নামের এক শিশুর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি হাত ও পা ভেঙে গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। বাকি শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাটি মূলত নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের একটি প্রকট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে, যেখানে দায়িত্বহীনতার কারণে শিশুদের জীবন আজ হুমকির মুখে পড়েছে।
ভুক্তভোগী শিশু আল আমিনের বাবা বিপ্লব হোসেন ও মা খাদিজা বেগম পেশায় পোশাকশ্রমিক। তারা ধামরাই পৌরসভার পাঠানটুলা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন এবং তাদের আদি নিবাস ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায়। ঘটনার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন এবং সন্তানের চিকিৎসার জন্য দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাগনগর মডেল টাউনের ওই ভবনটিতে ছাদে ওঠার সিঁড়ি সম্পূর্ণ অরক্ষিত এবং ছাদের চারপাশে কোনো ধরনের বাউন্ডারি ওয়াল বা নিরাপত্তা রেলিং নেই। নির্মাণাধীন ভবনের মালিক সাইদুর রহমান কোনো প্রকার নিরাপত্তা সতর্কতা অবলম্বন না করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা মূলত স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির অভাবকেই নির্দেশ করে। শিশুদের অভিভাবকরা এই দুর্ঘটনার জন্য ভবন মালিকের চরম অবহেলা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, যথাযথ নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকলে শিশুরা ছাদ থেকে নিচে পড়ার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতো না, যা নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান জানিয়েছেন যে, আইনি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো নির্মাণাধীন ভবন নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়া রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশি তদন্ত সাপেক্ষে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, শুধুমাত্র অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে প্রশাসনের উচিত প্রতিটি নির্মাণাধীন ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। ধামরাইয়ের মতো দ্রুত বর্ধনশীল এলাকায় একের পর এক ভবন নির্মিত হচ্ছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্মাণ শ্রমিক ও স্থানীয়দের সুরক্ষার বিষয়টি অবহেলিত থাকছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং স্থানীয় পৌর প্রশাসনের নজরদারির অভাবে যে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে, তা এখন স্পষ্ট। তাই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অঘটন রোধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে, যা নির্মাণাধীন প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মূলত যথাযথ আইন প্রয়োগের অভাব এবং নির্মাণাধীন সাইটগুলোতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না থাকার ফলে সাধারণ পথচারী ও শিশুরা নিয়মিত ঝুঁকির মধ্যে থাকছে। যদি এখনই ভবন নির্মাণ নীতিমালা কঠোরভাবে কার্যকর করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা প্রবল। প্রতিটি নির্মাণ সাইটে নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, যাতে উন্নয়নের নামে কোনো পরিবারের স্বপ্ন এভাবে ধূলিসাৎ না হয়। এই ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত, যেন আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরেও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে নির্মাণাধীন ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।