নীরব দুর্ভিক্ষ ও সংকুচিত অর্থনীতি: নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রায় নজিরবিহীন বিপর্যয়.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নীরব দুর্ভিক্ষ ও সংকুচিত অর্থনীতি: নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রায় নজিরবিহীন বিপর্যয়..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
নীরব দুর্ভিক্ষ ও সংকুচিত অর্থনীতি: নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রায় নজিরবিহীন বিপর্যয়..
নীরব দুর্ভিক্ষ ও সংকুচিত অর্থনীতি: নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রায় নজিরবিহীন বিপর্যয়..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে গত দুই বছরে খাদ্যপণ্যের প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় দেশ এক প্রকার নীরব দুর্ভিক্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছে।..

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত দুই বছরে এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকটের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কার্যত বিপর্যস্ত। ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে খাদ্যপণ্যের প্রকৃত মূল্যস্তর প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরমভাবে সংকুচিত করেছে। কারওয়ান বাজারের মতো পাইকারি কেন্দ্রের নিকটবর্তী নিউ ইস্কাটনের মতো এলাকায় সবজি বিক্রেতাদের ভ্যানে পণ্যের সরবরাহ অর্ধেক কমে যাওয়া এই সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, একদিকে পুঁজির ঘাটতি এবং অন্যদিকে নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের কারণে তারা পর্যাপ্ত পণ্য তুলতে পারছেন না। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকারিভাবে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে তা ৩,০০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা পরিবহন খরচ ও জ্বালানি সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই মূল্যস্ফীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি ব্যর্থতার প্রতিফলন, যেখানে মানুষ বাধ্য হয়ে খাদ্যের পরিমাণ কমিয়ে জীবন ধারণ করছে।

ভুক্তভোগী নিম্নবিত্ত মানুষ, বিশেষ করে দিনমজুর ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা এখন অভাবনীয় বঞ্চনার শিকার। গুলশান ও বনানীর মতো এলাকায় যে খাবার আগে ৩,০০০ টাকায় পাওয়া যেত, তা বর্তমানে ৬,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, অথচ আয় বাড়েনি বরং অনেকের কমেছে। এই পরিস্থিতিতে মাছ-মাংস দূরে থাক, অনেকেই কলা, বিস্কুট ও চা খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছেন। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫৭টি বড় কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে এর সাথে যুক্ত হাজার হাজার সাব-কন্ট্রাক্টর কারখানা অচল হয়ে পড়েছে, যা কর্মসংস্থান ও আয়কে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে বিলাসপণ্যের চাহিদা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ক্রেতাদের এই অনুপস্থিতিকে অনেকে তথাকথিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য হিসেবে দেখার ভুল করলেও, বাস্তবে এটি মানুষের জীবন মান ধসে পড়ার একটি অশনি সংকেত, যাকে অর্থনীতিবিদরা নীরব দুর্ভিক্ষ হিসেবে অভিহিত করছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে আইএমএফের শর্ত পূরণের নামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি প্রত্যাহার জনজীবনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র সাত মাসে তিনবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ডলার সংকট মোকাবিলায় সরকার বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ এবং আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আসা বন্ধ হয়ে গেছে, যা উৎপাদনমুখী খাতকে স্থবির করে দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানো আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতাকে প্রমাণ করে। সার সংকটের কারণে গুদাম লুটের মতো ঘটনাগুলো প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জনঅসন্তোষের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নীতিমালার অসামঞ্জস্যতার কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন কারখানা স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথকে আরও রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে। ডলারের বিনিময় হার যদি অদূর ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পায়, তবে আমদানিনির্ভর এই অর্থনীতিতে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির ধাক্কা আসবে, যা সাধারণ মানুষের টিকে থাকাকে অসম্ভব করে তুলবে। রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই ধাক্কা আসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণে কেবল আইএমএফের শর্ত পূরণই যথেষ্ট নয়, বরং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট ও মানবিক নীতি গ্রহণ জরুরি। অন্যথায়, এই নীরব দুর্ভিক্ষ সাধারণ মানুষের পুষ্টিহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতায়।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator