আটলান্টিক মৌসুমের প্রথম শক্তিশালী হারিকেন ইসাইয়াস বর্তমানে ঘণ্টায় ১৬৫ কিলোমিটার বাতাসের গতিবেগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মিসিসিপি নদীর মোহনা থেকে প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থানরত এই ঝড়টি শুক্রবার গভীর রাতে স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে বলে জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা পূর্বাভাস দিয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির এই হারিকেনটি আঘাত হানার সময় ফ্লোরিডার প্যানহ্যান্ডল অঞ্চল, দক্ষিণ আলাবামা এবং মিসিসিপির উপকূলীয় এলাকায় প্রাণঘাতী জলোচ্ছ্বাস ও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, ঝড়টি উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে ২২ কিলোমিটার গতিতে এগিয়ে চলায় সপ্তাহান্ত পর্যন্ত টেনেসি ও নর্থ ক্যারোলাইনা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহাল থাকবে। উপকূলীয় অঞ্চলে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ৩৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলার জন্য যথেষ্ট।
ঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে আলাবামা ও ফ্লোরিডার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপকূলীয় এলাকা থেকে হাজার হাজার বাসিন্দাকে বাধ্যতামূলক সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। বিশেষ করে ডফিন দ্বীপ, গালফ শোরস ও অরেঞ্জ বিচের পর্যটক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঝড়ের গতিপথ পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা তাদের চরম উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। লক্সলির বাসিন্দা নিকোল ইউব্যাংকস জানিয়েছেন, খামারের গবাদি পশু ও পোষা প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন, কারণ ঝড়ের ভয়াবহতা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব। অন্যদিকে, বায়ু লা বাত্রে গ্রামের মৎস্যজীবীরা নিজেদের নৌকা ও জীবিকার প্রধান উৎসগুলো রক্ষায় বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছেন, যা উপকূলীয় জনপদের সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব ও প্রস্তুতির বাস্তব চিত্রকেই তুলে ধরছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্লোরিডা ও আলাবামার গভর্নররা বেশ কিছু কাউন্টিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং ন্যাশনাল গার্ডের প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যকে মোতায়েনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস শুক্রবারের মধ্যে বিমানবন্দর কার্যক্রমসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে বয়স্ক ও সহায়তাহীন ব্যক্তিদের দিকে নজর দেওয়ার জন্য মেয়রদের পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তবে হারিকেনের শক্তি ও গতিপথের পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় কর্তৃপক্ষ কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। আবহাওয়া দপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, স্থলভাগে প্রবেশের পর ঝড়টি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও এর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই হারিকেনটি এমন এক সময়ে আঘাত হানতে যাচ্ছে, যখন অঞ্চলটি ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মেক্সিকো উপসাগরের অন্তত ৬৩ শতাংশ তেল উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, যার ফলে দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের বাজারে এই উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোও ঝড়ের কারণে বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৬৯ সালের ক্যামিল বা ২০০৫ সালের ক্যাটরিনার মতো ভয়াবহ হারিকেনগুলো এই অঞ্চলে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, ইসাইয়াস ঠিক সেই একই পথে অগ্রসর হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঝড়ের পরবর্তী প্রভাব কাটিয়ে স্বাভাবিক জনজীবনে ফিরতে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় ও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।