উত্থান-পতনের এক কঠিন পথ পেরিয়ে যেভাবে চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন শি জিনপিং.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

উত্থান-পতনের এক কঠিন পথ পেরিয়ে যেভাবে চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন শি জিনপিং..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
উত্থান-পতনের এক কঠিন পথ পেরিয়ে যেভাবে চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন শি জিনপিং..
উত্থান-পতনের এক কঠিন পথ পেরিয়ে যেভাবে চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন শি জিনপিং..
ছবি: সংগৃহীত
চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর ধরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ৭৩ বছর বয়সী শি জিনপিং। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কেবল দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ কাঠামোই পাল্টে দেননি, বরং..

রাজনৈতিক পরিবার ও আকস্মিক বিপর্যয়

১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণ করা শি জিনপিংয়ের বাবা শি ঝংজুন ছিলেন চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং পরবর্তীতে দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘রাজপুত্র’ পরিবারের সন্তান হিসেবে শৈশবে নামকরা স্কুলে পড়াশোনা এবং বিশেষ সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল তার।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বাবা শি ঝংজুনকে ‘দলবিরোধী’ চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করে গ্রামাঞ্চলের একটি কারখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কিশোর শি জিনপিংয়ের ওপরও। ‘প্রতিবিপ্লবী’র সন্তান তকমা লাগিয়ে তাকে পাঠানো হয় পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রে।

তৎকালীন নেতা মাও জেদংয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে হাজারো তরুণের সঙ্গে তাঁকেও গ্রামবাংলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে গ্রামের একটি গুহাবাড়িতে জীবনের প্রায় সাত বছর কাটাতে হয় তাকে। সেখানে কৃষিকাজের পাশাপাশি সার বহন ও নালা খননের মতো অত্যন্ত কঠিন শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। পরবর্তী সময়ে সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে শি বলেছিলেন, “ট্রেনের সবাই কাঁদছিল, কিন্তু আমিই একমাত্র হাসছিলাম।” ক্ষুধা ও উকুনের মতো সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে করতে সেই রুক্ষ জীবনই তাকে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছিল।

রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন ও শিক্ষা জীবন

২২ বছর বয়সে গ্রাম ছেড়ে বেইজিংয়ে ফিরে চীনের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন শি। পড়াশোনা শেষ করে ফুজিয়ান ও ঝেজিয়াং প্রদেশে স্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের সেই সময়ে উপকূলীয় এই প্রদেশগুলো চীনের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়।

এই সময়টাতে মাও জেদংয়ের মৃত্যুর পর তার বাবা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হন। বাবার পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ রাজদূতের মেয়ে কে লিংলিংকে বিয়ে করলেও তিন বছর পর তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে তিনি চীনের সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পী পেং লিউয়ানকে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র কন্যা শি মিংজে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন বলে জানা যায়।

সর্বোচ্চ ক্ষমতার শিখরে আরোহণ

২০০৭ সালে সাংহাইয়ের শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শি জিনপিং চীনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হন। এর মাত্র পাঁচ বছর পর, ২০১২ সালে হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরি হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

ক্ষমতায় আসার পর চীনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন শি। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে চীনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে তোলেন। দেশের ভেতরেও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে হংকং, তিব্বত ও শিনজিয়াংয়ে বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ নেন। এছাড়া ২০১৮ সালে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের সীমা তুলে দিয়ে নিজের আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম করেন।

বৈশ্বিক সম্পর্ক ও নেতৃত্ব

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শি জিনপিংয়ের কূটনীতি বেশ লক্ষ্যণীয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে তিনি নিজের ‘সবচেয়ে কাছের আস্থাভাজন’ হিসেবে গণ্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চললেও ট্রাম্পের সঙ্গে তার একধরনের ব্যবসায়িক ও কূটনৈতিক বোঝাপড়া রয়েছে। তবে ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সম্পর্কের কিছু অবনতি ঘটে।

ব্যক্তিগত জীবনের চরম প্রতিকূলতা, সবকিছু হারিয়ে গ্রামীণ জীবনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর দীর্ঘ লড়াই—সব মিলিয়ে কিশোর বয়সের সেই ‘রাজপুত্র’ আজ পরিণত হয়েছেন আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান নেতায়।

Geen reacties gevonden


News Card Generator