অক্টোবর মাসজুড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন বিক্ষোভ মোদী সরকারের দীর্ঘদিনের অপরাজেয় ভাবমূর্তিতে গভীর ফাটল ধরিয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের এই অহিংস অবাধ্যতা মূলত একটি সুসংহত রাজনৈতিক চাপে রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের প্রধান লক্ষ্য এখন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, যার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুবিধার্থে ভোটার তালিকা কারচুপির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দিল্লি থেকে মুম্বাই—দেশের প্রতিটি প্রান্তে এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা হারানোর চূড়ান্ত পর্যায়। ২০১৪ সালের পর থেকে মোদী সরকারের যে শক্তিশালী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক অবস্থান ছিল, তা এখন কেবল গায়ের জোর ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ওপর টিকে আছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে ভেঙে পড়ছে।
বিক্ষোভের এই ঢেউ কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি নারীর নিরাপত্তা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিগত বৈষম্য এবং নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতার মতো বহুমুখী সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দিল্লির আস্থাকুঞ্জ পার্কে সংঘটিত কিশোরী গণধর্ষণের ঘটনা এবং মুম্বাইয়ের আইআইটি বোম্বেতে সাহিল ওয়াকোডের আত্মহত্যার পর তার বাবা-মায়ের অনশন সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে নগ্ন করে দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার অভাব এবং উচ্চবর্ণের আধিপত্য তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। পুনের মহারাষ্ট্র পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনও সেই একই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে তারা স্বচ্ছতার অভাব ও ফলাফলের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে। এই প্রতিটি ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকরা এখন আর নীরব দর্শক হয়ে থাকতে রাজি নয়, বরং তারা ক্ষমতার সাথে দায়িত্বশীলতার সরাসরি যোগসূত্র দাবি করছে।
সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান বা আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি, বরং কঠোর নিরাপত্তা ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে অবরুদ্ধ করে রাখার মাধ্যমে সরকার কার্যত নিজের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে। বিরোধী দলগুলো এই সুযোগে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের দাবি জোরালো করেছে এবং নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলেছেন রাহুল গান্ধীর মতো শীর্ষ নেতারা। জুলাই মাসে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর মোদী সরকারের যে দম্ভে চিড় ধরেছিল, বর্তমান বিক্ষোভগুলো তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো গঠনমূলক সংলাপের পরিবর্তে যেভাবে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান আস্থাহীনতাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
পরিবহন ও জনজীবনসহ ভারতের সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোতে এই অস্থিরতার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। মোদী সরকারের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল ভোটারদের ওপর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো, কিন্তু আজকের জেনারেশন জেড এবং সচেতন নাগরিকরা সেই চেনা ছক ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। মিম বা সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মোদীর যে ভাবমূর্তিকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তা নির্দেশ করে যে সাধারণ মানুষ এখন আর সরকারকে ‘অনিবার্য’ মনে করে না। যদি এই বিক্ষোভ অক্টোবর মাসজুড়ে অব্যাহত থাকে এবং বিরোধী দলগুলো তাদের পাঁচটি বড় সমাবেশের মাধ্যমে জনমতকে আরও সংহত করতে পারে, তবে তা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। শেষ পর্যন্ত, এই আন্দোলন কেবল একটি সরকারের পতন বা পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার একটি আপসহীন প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত হবে।