পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অবিলম্বে মুক্তি এবং তাঁর স্বাস্থ্যগত অবস্থার উন্নতির দাবিতে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লাক্কি মারওয়াত থেকে হাজার হাজার সমর্থক একটি বিশাল পদযাত্রা শুরু করেছেন। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) আয়োজিত এই কর্মসূচিটি মূলত গত সপ্তাহেই শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, সরকারের সাথে আলোচনার সুযোগ রাখতে তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে পিটিআই নেতাদের সাথে কারাবন্দী খানের সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ না দেওয়ায় এবং আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় দলটি পুনরায় রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি জানিয়েছেন, এই পদযাত্রা পর্যায়ক্রমে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হবে এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ রাজধানীর প্রধান প্রবেশপথগুলো বন্ধ করতে বিশাল শিপিং কন্টেইনার বসিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে, যা সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইমরান খানের পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যার ফলে তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর দুর্নীতির দায়ে ১৭ বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর থেকে খান শতাধিক আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, যেগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন। ভুক্তভোগী দলের দাবি, সরকার কেবল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসাই করছে না, বরং তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েও চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে। বিশেষ করে, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দিয়ে তাঁকে পরীক্ষা করাতে না দেওয়া এবং দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে খানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা পিটিআই কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কর্মীরা মনে করছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে ইমরান খানকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই নিপীড়নমূলক কৌশল অবলম্বন করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের বর্তমান সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদযাত্রাকে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি সরাসরি খাইবার পাখতুনখোয়া সরকারের বিরুদ্ধে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছেন। সরকারের দাবি, পিটিআই সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী ইস্যুতে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং আলোচনার চেয়ে সংঘাতকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে, ইমরান খান চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ আছেন এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে সাবেক তারকা ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া ইমরান খানের যথাযথ চিকিৎসার জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। প্রশাসনের এই অনমনীয় মনোভাব এবং পিটিআইয়ের জেদ—উভয়ই দেশটির বিদ্যমান রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পদযাত্রা ও পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তাপ পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অস্থির পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অতীতে ইমরান খানের গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে প্রাণঘাতী সহিংসতা ও সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হওয়ার ভয় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল। পিটিআই যদি তাদের দাবি আদায়ে কঠোর অবস্থানে অটল থাকে এবং সরকার যদি আলোচনার পথ বন্ধ রেখে দমন-পীড়নের নীতি অব্যাহত রাখে, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশটিতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংঘাত কেবল ইমরান খানের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পাকিস্তানের সামগ্রিক গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে, যা সাধারণ নাগরিকদের জনজীবনকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।