কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণ হ্রাস: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক সংকেত নাকি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের চাপ.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণ হ্রাস: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক সংকেত নাকি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের চাপ..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণ হ্রাস: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক সংকেত নাকি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের চাপ..
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণ হ্রাস: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক সংকেত নাকি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের চাপ..
ছবি: সংগৃহীত
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৭৮৮ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ..

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের আর্থিক খাতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ গ্রহণ না করে উল্টো আগের নেওয়া ঋণের ৭৮৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। গত জুন মাস শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৪ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী কমে দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকায়। সাধারণত সরকারি ব্যয় নির্বাহে রাজস্ব আয় অপর্যাপ্ত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়, যা বাজারে নতুন টাকা সরবরাহের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। সরকারের এই ঋণ পরিশোধের সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করার পাশাপাশি বাজারে অতিরিক্ত তারল্য প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই চিত্রটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কেবল একটি অংশ মাত্র, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণের চাপ কমলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর ঋণের বোঝা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণের স্থিতি কমলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত জুন শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ১৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার অতিরিক্ত ২৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই প্রবণতা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা মূলধন সংকটে পড়তে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারি ঋণের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের দুয়ার সংকুচিত করে ফেলছে, যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি মেটাতেই মূলত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে এই ঋণের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তিনি আরও যোগ করেন যে, রাজস্ব আদায়ের গতি ও সরকারি ব্যয়ের ধরনের ওপর ভিত্তি করেই ঋণের উৎস নির্ধারিত হয়। তবে অর্থনীতিবিদরা এই ব্যাখ্যাকে যথেষ্ট মনে করছেন না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কমানোকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ নেয়, তবে তা কেবল ঋণের উৎসের পরিবর্তন ঘটায়, মোট ঋণের বোঝা কমায় না। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করাই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র টেকসই পথ, অন্যথায় বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ক্রমাগত ঋণ গ্রহণ দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পরিশেষে, সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা এবং রাজস্ব খাতের দুর্বলতা দেশের বর্তমান অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার মোট এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে প্রথম তিন মাসেই প্রায় ২৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে উত্তোলিত হয়েছে। এই ঋণ গ্রহণের হার অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের উচিত প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। যদি সময়মতো কার্যকর আর্থিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে সরকারি ঋণের এই উচ্চ হার দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator