সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ইতিহাসে শিক্ষা খাতে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। চলমান শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে এই বাজেট বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো শিশুই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে না। নতুন সিলেবাস অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং আনন্দময় শিখন পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বইমুখী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি আধুনিক ও সৃজনশীল কাঠামোর দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান সংকট এবং বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রযুক্তিকে শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে নয় বরং সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ এবং নিরবচ্ছিন্ন ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, সনাতন পাঠদান পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক শিক্ষায় পারদর্শী হলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা সেই ঘাটতি পূরণের একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তিগত সুবিধা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এর সুফল পাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এছাড়া আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে পাঠ্যবইয়ের আধুনিকায়ন এবং শিখন কৌশল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে তিনি বলেন, শিক্ষাদানের কৌশল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের পেশাগত মানোন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও গঠনমূলক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, শিক্ষকতা পেশা যেন কোনোভাবেই উপায়হীন মানুষের বিকল্প পেশা হিসেবে গণ্য না হয়। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় প্রথম পছন্দের তালিকায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা হবে এবং তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারি এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকতা পেশার সামাজিক মর্যাদা ও গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। তবে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ট্রেনিং কলেজগুলোর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা খাতের এই বিশাল বাজেট বরাদ্দ এবং আধুনিকায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা দেশের সামগ্রিক পরিবহন ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এই সংস্কার অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই রূপকল্প যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাব এই মহতি উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার গুণগত মান এবং জাতীয় উন্নয়নের গতিপথ।