জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনের তথ্যানুযায়ী, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত চার দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং বিশ্বের ১১টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মিলিত হন। গতানুগতিক প্রটোকল ভেঙে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে যাতায়াত এবং সীমিত আকারের প্রতিনিধিদল নিয়ে এই সফর সম্পন্ন করা বর্তমান সরকারের মিতব্যয়িতা ও কর্মতৎপরতার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে বিশ্বনেতাদের সামনে তার ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল দীর্ঘকাল পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার শক্তিশালী প্রতিফলন, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টে অংশগ্রহণ ও উপস্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং রিসাইকেলেবল এনার্জিতে গুরুত্বারোপের রূপরেখা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে ১ লাখ নতুন কর্মী নিয়োগ ও মিডওয়াইফারি উন্নয়নের সরকারি প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির বার্তাই দেয়। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বিশ্ব সম্প্রদায় আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। মিয়ানমার থেকে উদ্ভূত এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি মানবিক সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বানটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী, যা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কূটনৈতিক আলোচনার বাইরেও প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সাথে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সংস্কার, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্ড মার্কেটের মতো নতুন ফিন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট চালুর বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির আধুনিকায়নের ইঙ্গিত দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় গেটস ফাউন্ডেশনের সাথে সম্পৃক্ততা এবং বোয়িং গ্লোবালের সাথে নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির অগ্রগতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে বিশ্বদরবারে কার্যকরভাবে তুলে ধরারই নামান্তর। ইসরায়েলের বক্তব্যের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউট ছিল জাতীয় নীতি ও আদর্শের প্রতি সরকারের দৃঢ় অবিচলতার প্রমাণ।
সমগ্র সফরটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক বলিষ্ঠ পদচারণা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের বিভিন্ন নারী নেতৃত্ব ও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণ এই সফরের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, এই সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছিল না, বরং সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা প্রতিষ্ঠার একটি দৃঢ় অঙ্গীকার। বর্তমান সরকারের এই কূটনৈতিক তৎপরতা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।