গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক বিস্ফোরক পোস্টের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা গ্রহণের অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে, কারণ জামায়াত তাদের আর অর্থ সহায়তা দিচ্ছে না। রাশেদ খাঁনের ভাষ্যমতে, জামায়াতের কাছ থেকে নেওয়া সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের জন্য এনসিপি বর্তমানে নতুন করে গণভিক্ষা কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করছে। অতীতে বন্যার ত্রাণ সহায়তা আত্মসাতের অভিযোগে জনরোষের মুখে এই কর্মসূচি বন্ধ রাখতে বাধ্য হলেও, স্থানীয় নির্বাচনের তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজনে তারা পুনরায় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া জোরদার করতে চাইছে। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, এনসিপি যদি এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তবে তিনি নিজে তাদের এই গণভিক্ষা তহবিলে এক লাখ টাকা অনুদান সংগ্রহের দায়িত্ব নেবেন, যা দলের আর্থিক স্বচ্ছতা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এনসিপি নেতাদের জীবনযাত্রার মান এবং তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে রাশেদ খাঁন প্রশ্ন তুলেছেন, মাত্র ১৮ মাসের ব্যবধানে কীভাবে এই নেতারা ‘জমিদার’ বনে গেলেন। তিনি অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এনসিপির এক ডজন নেতার জীবনযাত্রায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে, যা তাদের আলিশান কার্যালয় এবং দামী ফ্ল্যাট ভাড়ার মাধ্যমে স্পষ্ট। বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানার অতীতে করা মন্তব্যের সূত্র টেনে তিনি এনসিপি নেতাদের বর্তমান দুর্নীতি ও লাগামহীন বিলাসিতার তীব্র সমালোচনা করেন। রাশেদ খাঁনের মতে, যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকত, তবে এই নেতাদের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেত। এনসিপির নেতাদের এই ‘জমিদারি ভাবসাব’ এবং ক্ষমতার দাপট সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক সততার জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাশেদ খাঁন দাবি করেছেন, বিএনপি এনসিপিকে জাতীয় পার্টির মতো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে মেনে না নেওয়ায় তারা কৌশলগত কারণে জামায়াতের জোটে ভিড়েছে। তার মতে, এই জোটবদ্ধতা এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া করে দিয়েছে এবং তারা অল্প বয়সেই একটি ‘ধান্ধাবাজ দলে’ পরিণত হয়েছে। বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের বিপরীতে হাসনাত আব্দুল্লাহ বা নাহিদ ইসলামদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে যে সংশয় রয়েছে, তা-ও তিনি তার পোস্টে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। রাশেদ খাঁনের মতে, জনগণের ওপর ভিত্তি থাকলে তারা ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারতেন, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে তারা এখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জামায়াত ও এনসিপির এই বিরোধী দল হওয়ার প্রতিযোগিতাকে তিনি রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির একটি নোংরা খেলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ঘটনাটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি বড় প্রতিফলন। এনসিপির বিরুদ্ধে ওঠা এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা কেবল একটি দলের নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে গণ্য হবে। একদিকে গণভিক্ষার মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ এবং অন্যদিকে বিলাসবহুল জীবনযাপন—এই দুইয়ের বৈপরীত্য সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত করছে। রাশেদ খাঁনের এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা এনসিপি নেতৃত্ব কোনো কার্যকর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।