গত ৩০শে জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকে বাজার-ভিত্তিক করার ঘোষণা এবং তার ফলস্বরূপ টাকার আরও অবমূল্যায়ন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোর একটি চেষ্টা হলেও, এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয় এবং ফলস্বরূপ অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। এই পরিস্থিতিতে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার আমদানি-নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য। প্রশ্ন হলো, টাকার অবমূল্যায়ন এবং কাঠামোগত আমদানি-নির্ভরতার এই চক্র ভাঙতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত এবং এর জন্য কী ধরনের নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে?
টাকার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সংকট মূলত দেশের আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির একটি প্রতিচ্ছবি। জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য, শিল্প কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। যখন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যায়, তখন একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতে দেশীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ খরচ করতে হয়, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) এর তথ্যানুসারে, যদিও সম্প্রতি কিছু পণ্যের আমদানি হ্রাস পেয়েছে, তবে জ্বালানি তেল, সার এবং অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় এখনও উচ্চ। এই বর্ধিত ব্যয় পণ্যের খুচরা মূল্যে প্রতিফলিত হয়, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়কে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ দেশের প্রায় ৮০% জ্বালানি আমদানিনির্ভর। এই পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ তাদের কাঁচামাল আমদানিতে বেশি খরচ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চক্রকে আরও শক্তিশালী করছে।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির একটি বড় কারণ হলো কাঠামোগত আমদানি-নির্ভরতা। দেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, তার কাঁচামালের একটি বড় অংশের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি খাতেও সার, বীজ এবং কীটনাশকের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। এই নির্ভরশীলতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং টাকার অবমূল্যায়ন হলে তা আরও বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও দেশীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে আমদানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় বিনিয়োগও পরোক্ষভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আমদানি শুল্কের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করলেও, টাকার অবমূল্যায়নের ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য পদক্ষেপ নিলেও, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির বিকল্প তৈরি করা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যার জন্য সুচিন্তিত নীতি এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর আমদানি প্রতিস্থাপন নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
মূল্যস্ফীতির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ এবং তার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি মুদ্রানীতি কঠোর করেছে এবং সুদের হার বাড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। তবে, শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক নীতি, বাণিজ্য নীতি এবং বিনিয়োগ নীতির একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। CPD এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ছাড়া আমদানি-নির্ভরতার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে, ডলারের বিনিময় হারকে স্থিতিশীল করা এবং আমদানি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের পুঁজিবাজার, যা BSEC দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে, যা আমদানি প্রতিস্থাপনে সহায়তা করবে। তবে, এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী এবং এর জন্য প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি।
| অর্থবছর | গড় মূল্যস্ফীতি (CPI) | টাকার অবমূল্যায়ন (বনাম USD) | মোট আমদানি প্রবৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| ২০২০-২১ | ৫.৫৬% | ২.০৫% | ১৯.৬১% |
| ২০২১-২২ | ৬.১৫% | ৯.৮৩% | ৩৬.০০% |
| ২০২২-২৩ | ৯.০২% | ৮.৯৪% | -৩.৭৭% |
| ২০২৩-২৪ (নভেম্বর পর্যন্ত) | ৯.৬৯% | ৭.৫১% | -১০.৮৮% |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), EPB।
সুপারিশ
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং NBR যৌথভাবে একটি সুনির্দিষ্ট 'আমদানি যৌক্তিকীকরণ ও প্রতিস্থাপন নীতি-২০২৪' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল ছাড়া অন্যান্য পণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট হারে শুল্ক বৃদ্ধি এবং দেশীয় উৎপাদনকারীদের জন্য কর সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা হবে।
- EPB, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে একটি 'রপ্তানি বহুমুখীকরণ রোডম্যাপ ২০৩০' তৈরি করবে, যেখানে তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য (যেমন- ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিটি সেবা, চামড়াজাত পণ্য) উৎপাদনে প্রণোদনা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানে সহায়তা প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও তহবিল বরাদ্দ থাকবে।
- BSEC, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জাতীয় বিনিয়োগ তহবিল আইন-২০২৫' প্রণয়ন করবে, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী দেশীয় সঞ্চয়কে (যেমন- সরকারি বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড) সরাসরি আমদানি-প্রতিস্থাপনকারী শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা হবে এবং এর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।