পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিপ্রবাহে অনিশ্চয়তা এবং এর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহে ঘাটতি এবং তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের কৌশল, ঝুঁকি এবং সম্ভাবনার একটি সামগ্রিক পরিমাপ অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশের কৃষি মূলত নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের প্রায় ৭০-৮০% সেচনির্ভর কৃষির অবদান। তাই, পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, সরকার পানি অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বাঁধ নির্মাণ, খাল খনন, নদীর তীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) জল সাশ্রয়ী ধান ও অন্যান্য ফসলের জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য কম পানি ব্যবহার করে বেশি ফলন নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু এই উদ্ভাবনগুলোর ব্যাপক প্রচারে DAE-এর ভূমিকা অপরিহার্য। তবে, এসব বিনিয়োগের সিংহভাগই অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার উপর কেন্দ্র করে, যেখানে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার অভাবে বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি স্বল্পতা কৃষকদের সেচ খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকিগুলো বহুমাত্রিক। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত প্রভাব, যেমন—অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ সরাসরি কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরম চাপ সৃষ্টি করে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় BRRI-এর উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাতগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তির অভাব। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার মতো প্রধান নদীগুলোতে উজানের দেশগুলোর একতরফা পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য এক বড় ঝুঁকি। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় নদীগুলোর বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নিলেও, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার অভাবে এর কার্যকারিতা সীমিত। তৃতীয়ত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে নদী দূষণ একটি গুরুতর সমস্যা। বিভিন্ন শিল্প বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া সরাসরি নদীতে দূষিত পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে নদীর পানি সেচ বা পান করার অযোগ্য হয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য এবং কৃষি উভয় খাতের জন্যই হুমকিস্বরূপ। BARC এই বিষয়ে সমন্বিত গবেষণার উপর জোর দিলেও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো সত্ত্বেও, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সামনে বিশাল সম্ভাবনাও রয়েছে। সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা (IWRM) নীতির আলোকে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি, বিশেষ করে গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির স্থায়ী সমাধান। আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন—রিমোট সেন্সিং, জিআইএস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নদী পর্যবেক্ষণ, বন্যা পূর্বাভাস এবং পানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। DAE, BARI এবং BRRI-এর গবেষণালব্ধ জ্ঞান ব্যবহার করে কৃষকদের মধ্যে জল সাশ্রয়ী আধুনিক সেচ পদ্ধতি, যেমন—ড্রিপ ইরিগেশন এবং অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (AWD) পদ্ধতির ব্যাপক প্রচলন করা যেতে পারে। এছাড়াও, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ এবং নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) কঠোরভাবে অনুসরণ করে যেকোনো নতুন পানি প্রকল্পে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। BARC এই সকল গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোকে একত্রিত করে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যা ঝুঁকি হ্রাস করে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

সূচক ২০১৬-১৭ ২০২০-২১ লক্ষ্যমাত্রা (২০২৫)
মোট সেচাধীন এলাকা (মিলিয়ন হেক্টর) ৫.৬ ৬.০ ৬.৫ (DAE)
ধান চাষে জল সাশ্রয়ী পদ্ধতির ব্যবহার (শতাংশ) ১২% ২০% ৩৫% (BRRI/BARI সমন্বিত)
পানি সম্পদ খাতে সরকারি বিনিয়োগ (বিলিয়ন টাকা) ৮৫ ১১০ ১৫০
খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাতের সংখ্যা (প্রকাশিত) ৩০ ৪০ ৫০ (BARC সমন্বিত)

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জয়েন্ট রিভার্স কমিশন (JRC)-কে শক্তিশালী করে গঙ্গা পানি চুক্তি (১৯৯৬)-এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের জন্য সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা। এই পদক্ষেপ জাতীয় পানি নীতি (২০১৮) এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে।
  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর উদ্ভাবিত জল সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি (যেমন – অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং - AWD, ড্রিপ ইরিগেশন) কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচলনের জন্য সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা। এটি জাতীয় কৃষি নীতি (২০১৮)-এর আওতায় একটি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫)-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং শিল্প বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ও কার্যকর শোধনাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা। একই সাথে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB)-এর তত্ত্বাবধানে প্রধান নদীগুলোতে নিয়মিত ড্রেজিং ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলো বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator