ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

রনি চৌধুরী  avatar   
রনি চৌধুরী
ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ সমীক্ষা 'বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে ২০২৩'-এর প্রাথমিক ফলাফল উদ্বেগজ...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ সমীক্ষা 'বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে ২০২৩'-এর প্রাথমিক ফলাফল উদ্বেগজনক তথ্য উপস্থাপন করেছে, যেখানে দেখা গেছে ১৮-৬৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রতি চারজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন এবং প্রায় ৭% ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার খেলা নয়, বরং এটি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি ফিটনেস ও স্বাস্থ্য খাতে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। শহরের ফাস্ট-ফুড সংস্কৃতি, দৈহিক শ্রমের অভাব, এবং ডিজিটাল পর্দার প্রতি আসক্তি একটি নীরব ঘাতকের মতো দেশের জনস্বাস্থ্যকে গ্রাস করছে। এই প্রবণতা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এই ক্রমবর্ধমান সমস্যাটির মূলে রয়েছে শহুরে জীবনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তন। কর্মব্যস্ততা এবং যান্ত্রিকতা মানুষের দৈনন্দিন রুটিন থেকে শারীরিক কার্যকলাপকে প্রায় মুছে দিয়েছে। গণপরিবহন বা ব্যক্তিগত গাড়িতে দীর্ঘ সময় কাটানো, হাঁটার সুযোগ কমে যাওয়া, এবং অফিসের ডেস্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করার কারণে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বেড়েছে। একই সাথে, সহজলভ্য প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের অবাধ ব্যবহার স্থূলতা, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক ব্যাধি (NCDs) বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের দিকেও এই প্রবণতা ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে, কারণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষিভিত্তিক শ্রমের বদলে অকৃষি খাতের প্রসার ঘটছে এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করছে। ২০১৯ সালের জাতীয় এনসিডি প্রোফাইল অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগসমূহের কারণে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৭% ঘটছে, যা ২০০৯ সালের ৪৩% থেকে অনেক বেশি। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল সংক্রামক রোগকেন্দ্রিক নয়, বরং জীবনযাত্রাজনিত রোগগুলোই এখন বড় হুমকি। এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে কেবল চিকিৎসার উপর নির্ভর না করে বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনধারা পরিবর্তনের উপর জোর দিতে হবে, যা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১-এর মৌলিক দর্শনগুলির সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ।

জীবনযাত্রাজনিত এই রোগের বিস্তার দেশের অর্থনীতির উপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। World Bank-এর 'বাংলাদেশ হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট' (HSSP) এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগসমূহের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়নমূলক অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। শুধু চিকিৎসার পেছনেই নয়, এই রোগগুলো কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসুস্থতার হার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে, যার ফলে দেশের জিডিপিতে পরোক্ষভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির নিয়মিত চিকিৎসার খরচ, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং শারীরিক জটিলতা তার পরিবারের উপর আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করে এবং সার্বিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির গতি কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, আধুনিক জীবনধারার সাথে তাল মিলিয়ে ব্যক্তিগত ফিটনেস সেন্টার, ডায়েট ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, এগুলোর ব্যয়ভার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। শহরের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের একটি ক্ষুদ্র অংশ এই সুবিধাগুলো গ্রহণ করলেও, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। Asian Development Bank (ADB) তাদের 'বাংলাদেশ হেলথ সিস্টেমস স্ট্রেন্থেনিং প্রজেক্ট'-এর আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে বিনিয়োগের উপর জোর দিলেও, আধুনিক জীবনযাত্রার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও ব্যাপক ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং টেলিমেডিসিনের প্রসারের মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহর উভয় অঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলেও, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ফিটনেসকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনা জরুরি।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ফিটনেস খাতে দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। একদিকে, স্মার্টফোন অ্যাপ, পরিধানযোগ্য ডিভাইস (wearable devices) এবং অনলাইন ফিটনেস প্ল্যাটফর্ম মানুষকে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে এবং শারীরিক কার্যকলাপের দিকে উৎসাহিত করতে সাহায্য করছে। এই প্রযুক্তিগুলো মানুষের পদক্ষেপের সংখ্যা গণনা, ক্যালরি খরচ পর্যবেক্ষণ এবং ঘুমের মান যাচাই করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ফিটনেস ট্র্যাকিংকে সহজ করে তুলেছে। কিন্তু অন্যদিকে, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অত্যধিক ব্যবহার মানুষের মধ্যে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়িয়ে তুলছে। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, ভিডিও গেমে আসক্তি এবং অনলাইন বিনোদনে মগ্ন থাকা তরুণ প্রজন্মকে শারীরিক কার্যকলাপ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে, শিশুদের মধ্যে স্থূলতা এবং বয়ঃসন্ধিকালের তরুণদের মধ্যে জীবনযাত্রাজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যখন প্রযুক্তির প্রসারে কাজ করছে, তখন এর নেতিবাচক দিকগুলো মোকাবেলায়ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা আবশ্যক। যেমন, ডিজিটাল লিটারেসি প্রোগ্রামের পাশাপাশি ডিজিটাল সুস্থতা (digital wellness) নিয়েও সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে এবং একটি সুষম জীবনধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

সূচক ২০১৩ সালের ডেটা ২০২৩ সালের ডেটা (প্রাথমিক) উৎস
১৮-৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা ২০.০% ২৪.৯% WHO/BBS NCD Steps Survey
১৮-৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রবণতা ৫.১% ৭.১% WHO/BBS NCD Steps Survey
১৮-৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে স্থূলতার প্রবণতা (BMI ≥ ৩০) ৩.৫% ৬.১% WHO/BBS NCD Steps Survey
বার্ষিক স্বাস্থ্য ব্যয় (জিডিপি-এর শতাংশ) ২.৭% ৩.১% World Bank (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট)
অসংক্রামক রোগের কারণে মোট মৃত্যুর হার ৪৩% (২০০৯) ৬৭% (২০১৯) বাংলাদেশ জাতীয় এনসিডি প্রোফাইল

উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), World Bank এবং বাংলাদেশ জাতীয় এনসিডি প্রোফাইল।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১' এর আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট 'ফিটনেস ও সুস্থ জীবনধারা কর্মপরিকল্পনা' প্রণয়ন করতে হবে। এই কর্মপরিকল্পনার আওতায় দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত) নিয়মিত শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং 'জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ' এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ফিটনেস সেন্টার ও জনসমাগমস্থলগুলোতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষক ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (BFSA) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে 'খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর অধীনে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয়ের উপর উচ্চহারে কর আরোপ করতে হবে, পণ্যের মোড়কে পুষ্টিগত তথ্য এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকির স্পষ্ট সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং স্থানীয় কৃষকদের স্বাস্থ্যকর ও জৈব খাদ্য উৎপাদনে প্রণোদনা প্রদান করে বাজারজাতকরণে সহায়তা করতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে 'টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট' বা নতুন কোনো নগর উন্নয়ন নীতিমালার আওতায় দেশের সকল নতুন আবাসন প্রকল্প ও শহুরে উন্নয়নে পর্যাপ্ত সবুজ স্থান, হাঁটার পথ, সাইকেল লেন এবং উন্মুক্ত খেলার মাঠ অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান শহরাঞ্চলে পর্যায়ক্রমে এই সুবিধাগুলো সম্প্রসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রনি চৌধুরী

রনি চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator