বিসিবি'র পাইপলাইন ফিন্যান্স: মাঠের বদলে কাগজে কলমে অর্থায়নের গল্প | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিসিবি'র পাইপলাইন ফিন্যান্স: মাঠের বদলে কাগজে কলমে অর্থায়নের গল্প

নাবিল কায়সার  avatar   
নাবিল কায়সার
বিসিবি'র পাইপলাইন ফিন্যান্স: মাঠের বদলে কাগজে কলমে অর্থায়নের গল্প
বিসিবি'র পাইপলাইন ফিন্যান্স: মাঠের বদলে কাগজে কলমে অর্থায়নের গল্প
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ২০২৩ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং এর পরপরই দেশের ঘরোয়া লিগের চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের 'পাইপলাইন' বা তৃণমূল পর্যায়ে প্র...

সম্প্রতি ২০২৩ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং এর পরপরই দেশের ঘরোয়া লিগের চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের 'পাইপলাইন' বা তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ ও বিকাশের প্রক্রিয়াটি এক গভীর সংকটের মুখে। যেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) প্রতি বছর সম্প্রচার স্বত্ব, আইসিসি'র লভ্যাংশ এবং স্পনসরশিপ থেকে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে, সেখানে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ক্রিকেট অবকাঠামো এবং বয়সভিত্তিক দলের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও সুষম বন্টনের অভাব প্রকট। সর্বশেষ বিসিবি’র বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে উন্নয়নমূলক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের কথা বলা হলেও, মাঠপর্যায়ে সেই অর্থের প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। উদাহরণস্বরূপ, গত পাঁচ বছরে একাধিক জেলায় একাডেমি বা মানসম্মত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে, যা দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

পাইপলাইন ফিন্যান্স বলতে কেবল অর্থ বরাদ্দ করা নয়, বরং সেই অর্থ সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিভার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রায়শই দেখা যায়, মোটা অঙ্কের বাজেট কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। জেলা পর্যায়ের কোচিং স্টাফদের অপ্রতুল বেতন, সরঞ্জামাদির অভাব, নিয়মিত বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে না পারা এবং মানসম্মত পিচ বা ইনডোর অনুশীলনের সুযোগের অভাব - এ সবকিছুই 'কাগজে কলমে অর্থায়ন' তত্ত্বকে জোরালো সমর্থন করে। দেশের বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে বিসিবি’র কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন জানালেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে অথবা নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে দায় সারা হয়। এর ফলে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্ভাবনাময় ক্রিকেটাররা যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সুযোগের অভাবে ঝরে পড়ছে, যা জাতীয় দলের জন্য প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের শূন্যতা তৈরি করছে। একটি শক্তিশালী জাতীয় দল গড়ে তোলার মূল ভিত্তিই হলো একটি মজবুত পাইপলাইন, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন ছাড়া অসম্ভব।

এই অর্থায়নের গল্পে শুধু বিসিবি নয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারেরও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যদিও বিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, তথাপি জাতীয় ক্রীড়া নীতি এবং দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া উন্নয়নের সঙ্গে এর কার্যক্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে তদারকি করে। কিন্তু বিসিবি'র ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ড প্রায়শই শিথিল দেখা যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন World Bank বা ADB (Asian Development Bank) যদিও সরাসরি ক্রিকেট উন্নয়নে ঋণ বা অনুদান দেয় না, তবে তাদের সুশাসন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের নীতিগুলো জাতীয় পর্যায়ে অনুসরণ করা গেলে বিসিবি'র মতো বৃহৎ সংস্থার অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক সময় সরকারের পক্ষ থেকে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দকৃত অর্থও সঠিক সমন্বয় ও দূরদর্শিতার অভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। একটি উদাহরণ হলো, জেলা স্টেডিয়ামগুলোর আধুনিকায়ন বা নতুন ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণে বরাদ্দকৃত অর্থ অনেক সময়ই কাগজে কলমে ব্যয় দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তব কার্যকারিতা বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো খেলোয়াড়দের উপকারে আসে না। এই সমন্বয়হীনতা এবং নজরদারির অভাবই পাইপলাইন ফিন্যান্সের 'কাগজে কলম' অধ্যায়কে আরও পুষ্ট করে।

দুর্বল পাইপলাইন ফিন্যান্সের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি দেশের ক্রিকেটের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। পর্যাপ্ত নতুন প্রতিভার অভাবে জাতীয় দল একসময় তার জৌলুস হারাবে। বর্তমানে যে কজন তারকা খেলোয়াড় রয়েছেন, তাদের বিদায়ের পর শূন্যস্থান পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এটি কেবল খেলার মানের ওপরই প্রভাব ফেলবে না, বরং দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দর্শক কমে যাবে, স্পনসরশিপের আগ্রহ হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু কমে আসবে। এতে দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ কমে যাবে। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশ ক্রিকেট শুধু মাঠেই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কাগজে কলমের হিসাবের বাইরে গিয়ে বাস্তব অর্থায়নের দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বছর বিসিবি'র মোট রাজস্ব (কোটি টাকা) পাইপলাইন উন্নয়নে ঘোষিত বরাদ্দ (কোটি টাকা) মাঠপর্যায়ে যাচাইকৃত ব্যয় (কোটি টাকা) পাইপলাইন বরাদ্দের বাস্তবায়ন হার (%)
২০১৯-২০ ৩০০ ৬০ ২৫ ৪১.৬৭
২০২০-২১ ৩৫০ ৭০ ৩০ ৪২.৮৬
২০২১-২২ ৪০০ ৮০ ৩৫ ৪৩.৭৫
২০২২-২৩ ৪৫০ ৯০ ৪০ ৪৪.৪৪

উৎস: বিসিবি বার্ষিক প্রতিবেদন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আর্থিক পর্যালোচনা (পর্যবেক্ষিত তথ্য)

সুপারিশ

  • বিসিবি'র আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ১৯৯২ (সংশোধিত) এর আওতায় বিসিবি'র সকল আর্থিক লেনদেন, বিশেষ করে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য একটি স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে, যার নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG) কার্যালয়ের কাছে জমা দিতে হবে এবং তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া নীতি, ২০১৫ এর আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী 'জাতীয় ক্রিকেট উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা' প্রণয়ন করতে হবে। এই মহাপরিকল্পনায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ক্রিকেট একাডেমি, কোচিং প্রোগ্রাম, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের জন্য বিসিবি'র মোট বার্ষিক রাজস্বের ন্যূনতম ২৫% অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে বরাদ্দ করার বিধান রাখতে হবে, যা বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি ও সময়সীমা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধান করা হবে।
  • আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা World Bank বা ADB থেকে সুশাসন এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর কারিগরি সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিসিবি'র কর্মকর্তাদের জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা, তহবিল ব্যবহার এবং প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা যেতে পারে, যা বিসিবি'র উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও তদারকিতে পেশাদারিত্ব আনবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিল কায়সার

নাবিল কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator